২০২৬-এর নির্বাচনী দামামা বাজিয়ে শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে তৃণমূল সরকারকে নজিরবিহীন আক্রমণ শানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত ছয়টি জনসভায় তিনি ‘পরিবর্তন’-এর ডাক দিলেও, এদিনের ভাষণে তাঁর সুর ছিল আরও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং হুঁশিয়ারিতে ঠাসা। শুধুমাত্র সরকার বদল নয়, বরং ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রতিটি অনিয়মের ‘হিসাব’ বুঝে নেওয়ার কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী। ৪৫ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণে অন্তত তিনবার এই হুঁশিয়ারির সুর শোনা গেল তাঁর কণ্ঠে।
সাংগঠনিক সাফল্যের নজির: জনসমুদ্রে ভাসল ব্রিগেড
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শনিবারের এই সমাবেশ ছিল রাজ্য বিজেপির এ যাবৎকালের অন্যতম সফল এবং সুসংগঠিত কর্মসূচি।
- সংগঠিত জমায়েত: দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে বাসে করে এবং উত্তরবঙ্গ থেকে ১৬টি বিশেষ ট্রেন ভাড়া করে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে আসা হয়েছিল।
- সাফল্য: ব্রিগেডের মাঠ উপচে পড়া এই ভিড়কে রাজ্য বিজেপির সাংগঠনিক সক্ষমতার এক বড় প্রমাণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই জনস্রোত দেখে দরাজ প্রশংসা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, তৃণমূল সরকার এই সমাবেশ আটকাতে রাস্তা বন্ধ করা থেকে শুরু করে পতাকা ছেঁড়া— সব রকমের ‘অস্ত্র’ ব্যবহার করেছিল। মোদীর কথায়, “নির্মম সরকার দেখে নাও, তোমরা কাউকে দমিয়ে রাখতে পারোনি। কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে।”
তিন দফার হুঁশিয়ারি: “অপরাধীদের জায়গা হবে জেল”
এদিনের ভাষণে মোদী তিনবার নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে হুঁশিয়ারি দেন: ১. সাত মিনিটের মাথায়: তিনি প্রথমবার বলেন, “সেই দিন দূরে নয়, যখন পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন হবে। কোনও অত্যাচারীকে ছাড়া হবে না, খুঁজে খুঁজে হিসাব নেওয়া হবে।” ২. আধ ঘণ্টার মাথায়: অপরাধীদের জেলে পাঠানোর ‘গ্যারান্টি’ দিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীরা জেলে থাকবে এবং ভয় দেখানোর দিন শেষ হতে চলেছে। ৩. ৩৭ মিনিটের মাথায়: শেষবার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, তৃণমূলের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। যারা অপরাধী, অনুপ্রবেশকারী বা তোষণের রাজনীতি করে, তাদের একটাই জায়গা— জেল।
উন্নয়ন বনাম কাটমানি: তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করে বারবার ‘নির্মম সরকার’ বলে কটাক্ষ করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে:
- কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাধা: পিএম বিশ্বকর্মা, আয়ুষ্মান ভারত এবং চা-বাগান শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গে চালু হতে দেওয়া হয়নি।
- কাটমানি সংস্কৃতি: মোদীর দাবি, “যতক্ষণ না এদের কাটমানি জুটবে, ততক্ষণ কোনও প্রকল্পের সুবিধা গরিবের কাছে পৌঁছোতে দেবে না।”
- আবাস যোজনা ও জল জীবন মিশন: প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া এবং প্রাপক তালিকায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে পরিষেবা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
বাঙালিয়ানা ও আবেগের স্পর্শ
তৃণমূলের ‘বাঙালি-বিরোধী’ বা ‘বহিরাগত’ তকমার জবাব দিতে মোদী এদিন নারী সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে দুটি বাক্য বাংলায় বলেন।
“এই স্বপ্ন আপনার। আর এই স্বপ্ন পূরণ করা মোদীর গ্যারান্টি।”
মেয়ের সুরক্ষা প্রসঙ্গে তাঁর বাংলা মন্তব্য, “বাড়ি ফিরে এসো সন্ধে নামার আগে”— সাধারণ মানুষের আবেগকে স্পর্শ করার এক সচেতন প্রচেষ্টা বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
জাতীয়তাবাদ ও সম্মানের লড়াই
মোদীর ভাষণে উঠে আসে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাত এবং ২০১৯-এর বালাকোট এয়ারস্ট্রাইকের প্রসঙ্গও। তিনি দাবি করেন, তৃণমূল বাংলার অরাজকতা দিল্লিতেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সব শেষে তাঁর মন্তব্য, “এবারের নির্বাচন শুধু সরকার বদলানোর নয়, বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর নির্বাচন।”
শনিবারের এই ব্রিগেড সমাবেশ রাজ্য জুড়ে চলা বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ আসলে আসন্ন ভোটের এক নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করে দিয়ে গেল।

