২০২৬-এর লক্ষ্যে রণকৌশল চূড়ান্ত বিজেপির: মোদীর বাসভবনে বৈঠকে ১৪০ আসনের নাম চূড়ান্ত, গুরুত্ব পাচ্ছেন ‘ভূমিপুত্ররা’

২০২৬-এর লক্ষ্যে রণকৌশল চূড়ান্ত বিজেপির: মোদীর বাসভবনে বৈঠকে ১৪০ আসনের নাম চূড়ান্ত, গুরুত্ব পাচ্ছেন ‘ভূমিপুত্ররা’

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। নির্বাচন কমিশন ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করার আগেই রণকৌশল সাজাতে একধাপ এগিয়ে থাকল গেরুয়া শিবির। জি নিউজ (Zee News) সূত্রে খবর, নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাচনী কমিটির (CEC) গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে প্রায় ১৪০টি আসনে প্রার্থীর নাম মোটামুটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।


উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও ‘উইনেবিলিটি’ মন্ত্র

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনে আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, দলের নবনিযুক্ত সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন এবং রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এবারের নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দল ‘উইনেবিলিটি’ বা জেতার ক্ষমতাকেই প্রধান মাপকাঠি হিসেবে রেখেছে।

প্রার্থী তালিকার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • পুরনো কর্মীতে ভরসা: ২০২১-এর তারকা-নির্ভর কৌশলের বদলে এবার দল মূলত ‘ভূমিপুত্র’ এবং দীর্ঘদিনের পুরনো কর্মীদের ওপর বাজি ধরছে।
  • প্রাক্তন সাংসদদের প্রত্যাবর্তন: সূত্রের খবর, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে বিধানসভা নির্বাচনে লড়াতে পারে দল।
  • শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা: বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তাঁর নিজের গড় থেকেই লড়বেন বলে একপ্রকার নিশ্চিত।
  • বর্তমান বিধায়কদের ভাগ্য: গত নির্বাচনে জয়ী এবং অনুগত বিধায়কদের অধিকাংশকেই পুনরায় টিকিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সপ্তম বেতন কমিশন ও কর্মসংস্থানের কার্ড

প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি ইস্তেহারের মূল স্তম্ভগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ইতিমধ্যেই বড় ঘোষণা করেছেন:

“বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘সপ্তম বেতন কমিশন’ (7th Pay Commission) কার্যকর করা হবে।”

পাশাপাশি, রাজ্যের শূন্য পড়ে থাকা সরকারি পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষিত যুবসমাজের সমর্থন আদায়ের কৌশল নিয়েছে পদ্মশিবির।


মাইক্রো-লেভেল প্রচার: ১ লক্ষ ‘ড্রয়িং রুম মিটিং’

বিজেপি এবার বড় জনসভার পাশাপাশি নিচুতলার প্রচার বা ‘মাইক্রো-লেভেল’ প্রচারের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।

  • টার্গেট: রাজ্য জুড়ে প্রায় ১ লক্ষ ‘ড্রয়িং রুম মিটিং’ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
  • উদ্দেশ্য: ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তৈরি করা ‘চার্জশিট’ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

জাতিগত সমীকরণ ও আঞ্চলিক রাজনীতি

১৪০টি আসনের তালিকায় উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজ এবং দক্ষিণবঙ্গের মতুয়া ও আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ার মতো জেলাগুলোতে, যেখানে বিজেপির সংগঠন শক্তিশালী, সেখানে আগেভাগেই প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করে প্রচার শুরু করতে চাইছে দিল্লি।


রাজনৈতিক লড়াই ও তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া

বিজেপির এই আগাম তৎপরতাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের দাবি, বিজেপি যত আগেভাগেই প্রার্থী দিক না কেন, বাংলার মানুষ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের নিরিখেই ভোট দেবেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল ইতিমধ্যেই তাদের জনসংযোগ কর্মসূচি শুরু করে দিয়েছে।

২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলার রাজনীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হতে চলেছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে অভিজ্ঞ মুখ এবং স্থানীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির এই পরিকল্পিত চাল তৃণমূলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় কি না, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.