চোখের জলে চিরবিদায়: কেওড়াতলায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো অভিনেতা রাহুল অরুণোদয়ের, ময়নাতদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

চোখের জলে চিরবিদায়: কেওড়াতলায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো অভিনেতা রাহুল অরুণোদয়ের, ময়নাতদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

শেষ হলো একটি বর্ণময় অধ্যায়। সোমবার সন্ধ্যায় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পঞ্চভূতে বিলীন হলেন অভিনেতা ও লেখক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার বিকেলে ওড়িশার তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং চলাকালীন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। সোমবার ময়নাতদন্তের পর তাঁর দেহ কলকাতায় আনা হলে শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা টলিপাড়ায়। বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে ১৩ বছরের পুত্র সহজ।

ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট: যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর ইঙ্গিত

সোমবার সকালে তমলুক মহকুমা হাসপাতালে রাহুলের দেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। প্রাথমিক রিপোর্টে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জলে ডুবেই (Drowning) মৃত্যু হয়েছে অভিনেতার। তবে মৃত্যুর আগের মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে:

  • ফুসফুসের ভেতরে অস্বাভাবিক পরিমাণে বালি এবং নোনা জল পাওয়া গিয়েছে।
  • বালু ঢুকে গিয়েছিল তাঁর খাদ্যনালি, শ্বাসনালি ও পাকস্থলীতেও। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ জলের তলায় আটকে থাকলে বা ডুবে থাকলে শরীরের অভ্যন্তরে এভাবে বালি ও জল ঢুকে যায়।

শেষযাত্রায় জনজোয়ার ও টলিপাড়ার শ্রদ্ধা

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই রাহুলের নিথর দেহ পৌঁছায় বিজয়গড়ে তাঁর বাসভবনের সামনে। প্রিয় অভিনেতাকে শেষবার দেখতে ভিড় জমান প্রতিবেশী ও অসংখ্য অনুরাগী। সকালে অভিনেতার ফ্ল্যাটে পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা সরকার ও পুত্র সহজ। উপস্থিত ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রূপাঞ্জনা মিত্রের মতো তারকারা।

বিকেলের দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেওড়াতলা শ্মশানে। শেষযাত্রায় শামিল হন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস, পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, অঙ্কুশ হাজরা, সায়নী ঘোষ, শ্রীলেখা মিত্র ও ঊষসী চক্রবর্তী প্রমুখ। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় উপস্থিত ছিলেন শতরূপ ঘোষ, দীপ্সিতা ধর-সহ বহু বাম নেতা-কর্মী। শ্মশানের বাইরে ভিড় সামলাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। অভিনেতা ‘অরুণ’-কে (ডাকনাম) শেষ দেখা দেখতে চাওয়া স্কুল বন্ধুদের ভিড়ে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে হাজারো প্রশ্ন

রাহুলের এই অকাল মৃত্যু টলিপাড়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রূপাঞ্জনা মিত্র ও শ্রীলেখা মিত্ররা সরব হয়েছেন প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে। তাঁদের প্রশ্ন:

“জলের দৃশ্যের শুটিং চলাকালীন কেন কোনো পেশাদার ডুবুরি (Diver) বা আপৎকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখা হয়নি?”

উল্লেখ্য, ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের ইউনিটের পক্ষ থেকে কেবল ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে উপস্থিত থাকতে দেখা গেলেও, প্রযোজক বা অন্য কোনো শীর্ষ আধিকারিকের অনুপস্থিতি নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

নিস্তব্ধ বিজয়গড়

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর ছেলে সহজকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেন প্রিয়াঙ্কা। তবে রাত বাড়লেও বিজয়গড় এলাকা ছিল থমথমে। পাড়ার ছেলে, বন্ধু ও অভিনেতা রাহুলের স্মৃতিতে পথবাতির আলোতেও যেন বিষণ্ণতার অন্ধকার ঘিরে রয়েছে তাঁর প্রিয় পাড়াকে। দিঘার তালসারিতে শুরু হওয়া এক ২৪ ঘণ্টার যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল কেওড়াতলার চিতাগ্নিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.