অধিকারের জয়গান: হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যু ও সুপ্রিম কোর্টের ৫টি ঐতিহাসিক রায়

অধিকারের জয়গান: হরীশ রানার নিষ্কৃতিমৃত্যু ও সুপ্রিম কোর্টের ৫টি ঐতিহাসিক রায়

১৩ বছর ধরে পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী দিল্লির যুবক হরীশ রানাকে ‘নিষ্কৃতিমৃত্যু’ বা প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি জেবি পর্দীওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর অমর উক্তি— “টু বি অর নট টু বি” উদ্ধৃত করে এই মানবিক রায় ঘোষণা করেন। হরীশের এই প্রস্থানলগ্নেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে বিগত এক দশকে দেশের শীর্ষ আদালতের দেওয়া বেশ কিছু যুগান্তকারী রায়, যা ভারতীয় সমাজে ‘ব্যক্তিগত অধিকার’ ও ‘মানবিকতা’র সংজ্ঞাকে নতুন করে লিখিয়েছে।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সুপ্রিম কোর্টের সেই ৫টি মাইলফলক রায়:


১. নিষ্কৃতিমৃত্যুর অধিকার (২০২৪)

২০১৩ সালে পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে ‘কোয়াড্রিপ্লেজিয়া’ রোগে আক্রান্ত হন হরীশ রানা। শরীরের চেতনা হারিয়ে কৃত্রিমভাবে বেঁচে থাকা এই যুবকের কষ্ট দেখে তাঁর বাবা-মা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, যন্ত্রণাদায়ক জীবন থেকে মুক্তি পাওয়াও একটি মানবিক অধিকার। আদালত কেন্দ্রকে এই বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট আইন তৈরিরও পরামর্শ দিয়েছে।

২. সমলিঙ্গ সম্পর্কের স্বীকৃতি (২০২৩)

তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন সাংবিধানিক বেঞ্চ জানায়, সমকামিতা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। সমলিঙ্গ বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি সংসদের এক্তিয়ারভুক্ত হলেও, আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে সমলিঙ্গ যুগলদের হেনস্থা করা যাবে না এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁদের অধিকার কোনো অংশে কম নয়।

৩. পরকীয়া অপরাধ নয় (২০১৮)

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ নম্বর ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, পরকীয়া কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। আদালত পর্যবেক্ষণ দেয় যে, পুরনো আইনটি মহিলাদের ‘স্বামীর সম্পত্তি’ বা পণ্য হিসেবে গণ্য করত, যা লিঙ্গ বৈষম্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী।

৪. সবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতীদের প্রবেশ (২০১৮)

কেরালায় সবরীমালা মন্দিরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী মহিলাদের প্রবেশে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা তুলে দেয় শীর্ষ আদালত। বিচারপতিরা জানান, নারী ও পুরুষ উভয়েই ঈশ্বরের সৃষ্টি। মন্দিরে প্রবেশের ক্ষেত্রে ঋতুচক্রের দোহাই দিয়ে বয়সের সীমা বেঁধে দেওয়া ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ এবং পূজার্চনার অধিকারের পরিপন্থী।

৫. তাৎক্ষণিক তিন তালাক রদ (২০১৮)

মুসলিম সমাজে প্রচলিত ‘তালাক-এ-বিদাত’ বা এক নিঃশ্বাসে তিনবার তালাক বলে বিবাহবিচ্ছেদের প্রথাকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে রায় দেয় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের বেঞ্চ। এই রায় মুসলিম মহিলাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অনিরাপত্তার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.