ব্যবধান আড়াই বছরের, ইটাহার হারিয়ে দিল ইটাহারকে! উত্তরের সংখ্যালঘু এলাকায় অভিষেকের জন‍্য ভিড়ের বহর মাপছে তৃণমূল

দৃশ্য এক: ১ মে, ২০২৩। কালো এসইউভির ছাদে দাঁড়িয়ে ভিড়কে অভিবাদন জানাচ্ছেন তিনি। পরনে সাদা ফুলহাতা শার্ট, কালো ট্রাউজ়ার্স।

দৃশ্য দুই: ৭ জানুয়ারি, ২০২৬। কালো এসইউভির উপর ছড়ানো গোলাপের পাপড়ি। তার উপরে কালো ফুলহাতা জ্যাকেট আর ধূসর ট্রাউজ়ার্স পরে দাঁড়িয়ে ভিড়কে অভিনন্দন জানাচ্ছেন সেই তিনিই।

কালের ব্যবধান আড়াই বছর। স্থান এক— উত্তর দিনাজপুরের ইটাহার। পাত্রও এক— অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৩ সালে উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ পর্যন্ত ‘নবজোয়ার যাত্রা’ করেছিলেন অভিষেক। কোচবিহার থেকে নামতে নামতে উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারে পৌঁছোতে সেই কর্মসূচি আক্ষরিক অর্থেই মানুষের ‘জোয়ার’ দেখেছিল। আড়াই বছরের ব্যবধানে রাজ্যে বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে আবার অভিষেক জেলা সফর শুরু করেছেন। বুধবার ইটাহারে তাঁর ‘রোড শো’ ছিল। আড়াই বছরের ব্যবধানে সেই ইটাহারের ভিড়ের বহর মাপতে শুরু করেছে তৃণমূল। অভিষেকের ঘনিষ্ঠেরা প্রাথমিক ভাবে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার পরে দাবি করছেন, নবজোয়ারের ভিড়কেও ছাপিয়ে গিয়েছে বুধবারের কর্মসূচির ভিড়। ইটাহারকে হারিয়ে দিয়েছে ইটাহারই!

জেলা সফর শুরুর আগেই উত্তর দিনাজপুরের তৃণমূল নেতাদের কাছে ‘বার্তা’ গিয়েছিল, তাঁদের জেলায় ‘রোড শো’ করবেন অভিষেক। এবং তা করবেন ইটাহারেই। প্রসঙ্গত, ইটাহার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিধানসভা। সেখানকার তরুণ বিধায়ক মোশারফ হোসেন তৃণমূলের সংখ্যালঘু সেলের চেয়ারম্যানও বটে। অতএব সেই বিধানসভায় অভিষেকের কর্মসূচিতে ভিড়ের বহর নিয়ে ‘উল্লসিত’ তৃণমূল নেতৃত্ব।

প্রকাশ্যে সেই উল্লাস না দেখালেও শাসকদলের নেতারা একান্ত আলোচনায় বলছেন, এ ভিড় নানা কারণে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূলের দিকে সংখ্যালঘুদের সমর্থন থাকলেও বিধানসভা ভোটের আগে তা অটুট থাকবে কি না, তা নিয়ে নানা মহলে কৌতূহলের উদ্রেক হয়েছে। প্রথমত, হুমায়ুন কবীরের বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা এবং শিলান্যাস, নতুন দল গড়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। দ্বিতীয়ত, মালদহের মৌসম নূরের তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে ফিরে যাওয়া। পাশাপাশি দু’টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলায় দুই নেতা-নেত্রীর তৃণমূলের প্রতি ‘বিরূপ’ ভাব থেকে জনমানসে একটা ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যে রয়েছে, তা শাসক শিবিরের নেতারা আড়ালে-আবডালে মেনেও নিচ্ছেন। পাশাপাশিই ওয়াকফ আইনের অংশবিশেষ পশ্চিমবঙ্গে বলবৎ করা-সহ একাধিক বিষয়কে ‘সূচক’ ধরেও সংখ্যালঘু ভোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে রাজনৈতিক মহলে। শাসকদলের নেতারা একান্ত আলোচনায় আশা-আশঙ্কার দোলাচলের কথা গোপন করছেন না। সেই প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ইটাহারে এ হেন ভিড়কে ‘মাইলফলক’ হিসাবেও দেখাতে চাইছে তৃণমূল।

আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। হুমায়ুন শুধু নতুন দল গঠন করেননি। ইতিমধ্যেই তিনি ঘোষণা করে দিয়েছেন, হায়দরাবাদের নেতা আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল মিমের সঙ্গে তিনি জোট বেঁধে ভোটে লড়বেন। মিম মূলত সংখ্যালঘুভিত্তিক দল। নিন্দকদের অভিযোগ, তারা বিজেপির হয়ে বিরোধী ভোট কাটার কাজ করে। ঘটনাচক্রে, এই উত্তর দিনাজপুর লাগোয়া বিহারের কিষণগঞ্জে তাদের মজবুত সংগঠন রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে জমি তৈরি করতে তারা ইসলামপুর, ইটাহার, ডালখোলা হয়েই প্রবেশ করতে চাইবে। সেই জনপদে অভিষেকের কর্মসূচির ভিড়কে তাই সময় এবং পরিস্থিতির নিরিখে আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে তৃণমূল।

যদিও এই উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত রায়গঞ্জ লোকসভায় গত নির্বাচনেও জয় পেয়েছে বিজেপি। এই জেলায় মেরুকরণের আবহও তীব্র। লোকসভার নিরিখে বিজেপি করণদিঘি, কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ, হেমতাবাদের মতো আসনে এগিয়ে রয়েছে। কংগ্রেস এগিয়ে রয়েছে চাকুলিয়ায়। ফলে তৃণমূলের জন্য অঙ্ক খুব সহজ নয়। সেই প্রেক্ষিতেই বুধবারের ভিড়কে আড়াই বছরের ব্যবধানে মাপছে তৃণমূল। যে কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতেই ভিড় সাফল্যের সূচক। তবে সেই ভিড় যে সবসময় ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়, তা নয়। যার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ সিপিএম। যদিও সিপিএমের ভিড় এবং তৃণমূলের মধ্যে মৌলিক ফারাক রয়েছে। কারণ, তৃণমূল শাসকদল। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে তারা রাজ্যের ক্ষমতায়।

এখনও পর্যন্ত অভিষেক চারটি জেলায় কর্মসূচি করেছেন। বুধবার রাতে তিনি মালদহে থাকবেন। বৃহস্পতিবার সেখানেই পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে মিলিত হবেন। সেখানে বিরাট ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা কম। অনেকটা আলিপুরদুয়ার মডেলে ‘প্রশ্নোত্তর ধাঁচে’ হবে কর্মসূচি। ঘটনাচক্রে, মালদহও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা। গত বিধানসভা নির্বাচনে যে জেলায় ভাল ফল করেছিল তৃণমূল। সেই কর্মসূচি কতটা দাগ কাটতে পারে, সে দিকে নজর থাকবে। বিশেষত ইটাহারের পরে। নজর থাকবে মালদহের কোতোয়ালির বাসিন্দা মৌসমের দলত্যাগের পরে অভিষেকের প্রথম কর্মসূচির উপরেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.