নিজেকে সোভিয়েত রাশিয়ার একনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে , স্তালিন একে একে তার একসময়ের সঙ্গীদের সরাতে থাকে। স্তালিনের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ব্যর্থতার দায় দেওয়া হয় বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি আধিকারিক, পার্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী, বিভিন্ন লেখক, ইঞ্জিনিয়ার, যৌথ খামারের ম্যানেজারের উপর। ‘দি গ্ৰেট পার্জ’ বা শুদ্ধিকরণের নামে সমাজের সর্বস্তরে নেমে আসে স্তালিনের দন্ডাদেশ — হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের গুলাগ ক্যাম্পে নির্বাসন বা গুলি করে হত্যা।
এই পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার ব্যর্থতার প্রভাব স্তালিনের দাম্পত্য জীবনেও পড়েছিল আর তারই জমে ওঠা বিষবাষ্প তার মা’কে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছিল, এমনটাই মত শ্বেতলানার ।
শ্বেতলানার মাতামহ সের্গেই আলিলুয়েভা ছিলেন একজন রেলওয়ে কর্মী, আর বলশেভিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তথাকথিত বিপ্লবের পূর্বে ভ্লাদিমির লেনিন এবং স্তালিন সহ অনেক বলশেভিককে তাদের পরিবার আশ্রয় ও সহায়তা দিয়েছিল। সেই সূত্রেই শ্বেতলানার মায়ের সঙ্গে স্তালিনের প্রেম ও বিয়ে।
১৯৩১ এ নাদেঝদা’র বয়স ৩১। রসায়ন বিভাগের এক নতুন শাখা Synthetic Fibre নিয়ে পড়াশোনা করছেন Industrial Academy তে। নাদেঝদা কখনোই চায় নি সোভিয়েত রাশিয়ার ‘First lady’ হতে, খুব সাধারণ তার চাওয়া — অন্য দুই বান্ধবীর মতোই একজন টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করবেন।
স্তালিনের থেকে ২২ বছরের ছোট, স্তালিনের প্রথম স্ত্রীর ছেলে ইয়াকভের থেকে মাত্র ৭ বছরের বড় শ্বেতলানার মা। ১৯২৮ সালে ইয়াকভ আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাকে মানসিক শক্তি যোগায় তার বিমাতা কিন্তু নিজের ছেলের প্রতি স্তালিনের শ্লেষ — “Ha! He couldn’t even shoot straight!” ।
স্তালিনের সমস্ত ব্যর্থ সম্পর্কের খামতিগুলো ভরাট করার দায়িত্ব শ্বেতলানার মায়ের। ইয়াকভের আত্মহত্যার চেষ্টা হয়তো নাদেঝদাকেও স্তালিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর প্রতি তৈরি হওয়া এক অস্বাভাবিক পরিবেশ থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল — “The shot made a deep impression on her; her own death later on may have been an echo of it. Yakov loved me and my mother’s parents. He loved and respected my mother very much.” ।
শ্বেতলানা তার মাসি আন্না রেডেন্স এর থেকেও সত্য খোঁজার চেষ্টা করেছে —“Recently my mother’s sister Anna told me that my mother used to think more and more often in her last years about leaving my father. Aunt Anna always says my mother was a ‘long-suffering martyr’ with my father, that he was callous and harsh and inconsiderate of her feelings, and that this upset her terribly because she loved him very much.”।
খুব সাধারণ জীবনযাপন চেয়েছিল নাদিয়া ( Nadezhda Sergeyevna Alliluyeva )। নিজের অল্প বয়সের প্রেমের সুন্দর পরিণতি চেয়েছিল। কিন্তু মার্ক্সবাদে দীক্ষিত এক বলশেভিক স্বৈরাচারীর সঙ্গে ঘরবাধা কতটা কঠিন তার প্রমাণ রেখে গেছেন নাদেঝদা। শ্বেতলানার বাড়ির নার্স, রক্ষী সবার বক্তব্য মিলে যায় নাদিয়ার বান্ধবী পলিনা মলোটভের সঙ্গে। স্তালিন পলিনা মলোটভ কে কাজাখস্তানে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। ১৯৫৫ সালে ফিরে এসে সে শ্বেতলানা কে জানায় — “Your father was rough with her and she had a hard life with him. Everyone knew that.” ।
মার্ক্সবাদ বলে, পরিবার হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটা রূপ। কিন্তু , ভারতীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী পরিবার , সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। ভালো পরিবারের সমষ্টি দিয়েই ভালো সমাজের নির্মাণ হয়। স্তালিন সোভিয়েত রাশিয়াকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ল্যাবরেটরি করতে গিয়ে পুরো সমাজকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে , তার নিজের পরিবার সেই আঘাত সমানভাবে সহ্য করেছে। স্তালিনের স্বৈরাচারী মনোভাব শুধু সরকার চালানোর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে নি , স্বৈরতন্ত্রের শিকার হয়েছে তার পরিবার ও পরিচিতদের সকলেই।
স্তালিনের সঙ্গে বিয়ের পর সহজ-সরল নাদিয়ার জীবনে বিপ্লব , গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ের গুরুত্ব বেড়ে যায় শুধুমাত্র তার ভালোবাসার মানুষটির টানে। তথাকথিত অক্টোবর বিপ্লবের পর থেকে সোভিয়েত রাশিয়ায় যেমন বদল শুরু হয়েছিল, নাদিয়াও স্কুলের ছাত্রী থেকে স্তালিনের দ্বিতীয় স্ত্রী রূপে পরিবর্তিত হলেন।
স্তালিন – নাদেঝদার জীবনের বৈপরীত্য বোঝাতে গিয়ে শ্বেতলানা বলেছে – “সে তার ভাগ্যটাকে তার সঙ্গে জুড়ে দিল, যেন একটি ছোট্ট পালতোলা নৌকা বিশাল সমুদ্রগামী স্টিমারের আকর্ষণে এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই আমি তাদের দেখি—উত্তাল মহাসাগরে পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে। কিন্তু কতক্ষণ সেই ছোট্ট নৌকাটি সমুদ্রগামী জাহাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে? তা কি প্রচণ্ড ঢেউ সামলে টিকে থাকতে পারবে, নাকি এমন তরঙ্গের আঘাতে উল্টে যাবে, যা সেই বিশাল জাহাজের কাছে কিছুই নয়?”।
সেই ছোট্ট পালতোলা জাহাজটি সত্যিই উল্টে গিয়েছিল, স্তালিনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সুনামিতে। কত পরিবার ভেসে গিয়েছিল , কত শিশু মাতৃহারা – পিতৃহারা হয়েছিল, কত নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল কমিউনিজমের নামে।
স্তালিনের জীবদ্দশায় তার জীবন কখনোই স্বাভাবিক ছিল না, নিজের পিতার মৃত্যুর পর তার জীবন থেকে যেন পাথর সরে গিয়েছিল, সে যেন মুক্তভাবে শ্বাস নিতে পেরেছিল — এ কথা কমিউনিস্টদের নায়ক স্তালিনের নিজের মেয়ের —-
“In a sense my life, too, couldn’t be normal so long as my father was alive. Could I have had as much freedom before as I have now? Could I conceivably have gone any place I wanted to without permission? Could I have met and made friends with anyone I pleased? Could my children have lived freely and without surveillance the way they do now? We can all breathe freely. It’s as though a heavy slab of stone had been lifted from us all.”।
সোভিয়েত রাশিয়ার বুক থেকে স্তালিন নামক পাথর সরার আগে লক্ষ লক্ষ কৃষককে অনাহারে মেরেছে, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কে মৃত্যুভয়ে শঙ্কিত করেছে সবসময়।
শ্বেতলানার আত্মকথায় সেই অজানা অচেনা মানুষদের প্রতিও সমবেদনা উঠে এসেছে আর উঠে এসেছে আলিলুয়েভা পরিবারের প্রত্যেকের করুণ পরিণতির কথা যার জন্য দায়ী তার পিতা স্তালিন।
এত প্রিয় জনের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে দিতে যে নিজেই মানসিক ভারাক্রান্ত তিনি পাঠকদের জানাচ্ছেন —
“তুমি সম্ভবত এখন ক্লান্ত, বন্ধুবর, আমি যে অগণিত মৃত্যুর কথা তোমাকে বলে চলেছি তা শুনতে শুনতে। আমি কি একটাও এমন মানুষকে চিনতাম যার জীবন ভালোভাবে কেটেছে? যেন আমার বাবা এক অন্ধকার বৃত্তের কেন্দ্রে ছিলেন, আর যে কেউ সেই বৃত্তের ভেতরে প্রবেশ করলেই হারিয়ে যেত, মারা যেত, বা কোনো না কোনোভাবে ধ্বংস হয়ে যেত “।
শ্বেতলানার স্মৃতিকথা প্রকাশিত হওয়ার এত বছর পরেও কমিউনিস্ট নামে পরিচিত কিছু মানুষ দাবি করে এই কালো বৃত্তের মাঝখানে থাকা মানুষটিই নাকি পৃথিবীকে সাম্যবাদের দিশা দিতে পারে !
পিন্টু সান্যাল
