লাল ব্রিফকেস থেকে ডিজিটাল ট্যাব: ভারতীয় বাজেটের ব্যাগে ঐতিহ্যের বিবর্তন

লাল ব্রিফকেস থেকে ডিজিটাল ট্যাব: ভারতীয় বাজেটের ব্যাগে ঐতিহ্যের বিবর্তন

প্রতি বছর বাজেট পেশের সকালে সংসদের সিঁড়িতে অর্থমন্ত্রীর হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটি দেশবাসীর কাছে অত্যন্ত পরিচিত। গত ছয় বছর ধরে এই ফ্রেমে দেখা যাচ্ছে নির্মলা সীতারমণকে। তার আগে অরুণ জেটলি থেকে শুরু করে পি চিদাম্বরম বা স্বাধীন ভারতের প্রথম অর্থমন্ত্রী আর. কে. সম্মুখম ছেট্টি— সকলেই এই রীতি পালন করেছেন। কিন্তু কেন এই ব্যাগ? আর সময়ের সাথে কীভাবে বদলেছে এর রূপ?

‘বুগেট’ থেকে বাজেট: ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

বাজেট শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘বুগেট’ (Bougette) থেকে, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘ছোট চামড়ার ব্যাগ’। আঠারো শতকে ব্রিটেনের অর্থ বিষয়ক আধিকারিকরা যখন বার্ষিক হিসাব দিতে আসতেন, তখন তাকে বলা হতো ‘ওপেন দ্য বুগেট’।

এই প্রথার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৮৬০ সালে। ব্রিটিশ চ্যান্সেলর উইলিয়াম ই গ্ল্যাডস্টোন রাজপরিবারের প্রতীক দেওয়া একটি লাল চামড়ার ব্রিফকেস নিয়ে বাজেট বক্তৃতা দিতে আসেন। সেই থেকেই এটি ‘গ্ল্যাডস্টোন বক্স’ নামে পরিচিতি পায়। ব্রিটিশ আমল থেকেই ভারত এই সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে।

ভারতের ব্যাগের বিচিত্র রূপ

স্বাধীন ভারতে ১৯৪৮ সালে প্রথম বাজেট পেশের সময় সম্মুখম ছেট্টি ব্রিটিশদের অনুকরণে লাল চামড়ার ব্রিফকেস ব্যবহার করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অর্থমন্ত্রী তাঁদের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী এই ব্যাগের ভোল বদলেছেন:

  • জওহরলাল নেহরু ও মনমোহন সিংহ: ১৯৫৮ সালে নেহরু এবং ১৯৯১ সালে ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সংস্কারের সময় মনমোহন সিংহ কালো চামড়ার ব্যাগ ব্যবহার করেছিলেন।
  • অরুণ জেটলি ও পীযূষ গোয়েল: বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে অরুণ জেটলি এবং অন্তর্বর্তী বাজেটের সময় পীযূষ গোয়েল মূলত কালো বা গাঢ় বাদামি অ্যাটাচি কেস ব্যবহার করতেন।
  • যশবন্ত সিনহা: ১৯৯৮ সালে তিনি গতানুগতিক ব্রিফকেসের বদলে হ্যান্ডেল দেওয়া কিছুটা আধুনিক চামড়ার ব্যাগ নিয়ে সংসদে এসেছিলেন।

নির্মলার ‘বজবদল’: খেরোর খাতা থেকে ডিজিটাল বিপ্লব

২০১৯ সালে দ্বিতীয় মোদী সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্মলা সীতারমণ কয়েক দশকের পুরনো ঔপনিবেশিক প্রথায় বড় পরিবর্তন আনেন। চামড়ার ব্রিফকেসের বদলে তিনি বেছে নেন ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতীক ‘বহি-খাতা’ বা লাল শালুতে মোড়া খেরোর খাতা।

তবে এই পরিবর্তন সেখানেই থেমে থাকেনি। ২০২১ সালে করোনা অতিমারি পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার পথে হেঁটে বাজেটকে সম্পূর্ণ ‘কাগজহীন’ (Paperless) করে তোলেন তিনি। খেরোর খাতার বদলে তাঁর হাতে আসে একটি লাল কভারে মোড়া ডিজিটাল ট্যাবলেট। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এই ট্যাব ব্যবহারের ধারা ২০২৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.