তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের পম্বন থেকে মান্নার আইল্যান্ডের তালাইমান্নার পর্যন্ত একটা প্রাচীর বা সেতুর মতো জিনিস রয়েছে৷ ছোটো বেলায় ভূগোল বইয়ে আমাদের শেখানো হয়েছে কোরাল বা প্রবাল জমা হয়ে এই প্রাচীর তৈরি হয়েছে৷ আমরাও এই বিশ্বাস নিয়ে বড় হয়েছি৷ যেমন ছোটবেলার ইতিহাস বই পড়ে আমরা মেনে নিয়েছি তিতুমীর ছিল মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী আর ক্ষুদিরাম সন্ত্রাসবাদী৷ সব ঠিকঠাকই চলছিল বাধ সাধন ২০১৭ সালে ডিস্কভারি সায়েন্স চ্যানেল, তাদের বিশ্ববিখ্যাত সায়েন্স শো ”What On Earth’ এর
”Ancient Land Bridge’ নামের একটি বিশেষ পর্বে বলে বসলেন ভারতের পম্বন দীপের দক্ষিণ-পূর্বের ধনুষকোডি থেকে শ্রীলঙ্কার মান্নার দীপ পর্যন্ত যে ব্রীজের মতো অংশটি রয়েছে তা প্রাকৃতিক নয় ‘ম্যানমেড’ অর্থাৎ মানুষের সৃষ্টি! ওখানে যে বেলেপাথরগুলি ব্রীজ আকারে সমুদ্র তলের উপরে থাকত একসময় এবং বর্তমানে সমুদ্রতলের খুবই অল্প নীচ (মাত্র ৩ ফুট) রয়েছে সেগুলি অন্য জায়গা থেকে এনে ওখানো বসানো হয়েছিল৷
অবশ্য এর আগেই এই সেতুটিকে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে৷ ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ ইন্জিনিয়ার আলফ্রেড টেলর এই সেতুর একটি অংশ কেটে একটি পথ তৈরির কথা বলেন জাহাজ চলাচলের সুবিধার জন্য। এরপর মাঝে মাঝে এ নিয়ে চর্চা হলেও কাজ বিশেষ শুরু হয়নি৷ ১৯৫৫ সালে ডঃ এ রামস্বামী মুদালিয়ারের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ‘সেতুসমুদ্রম প্রজেক্ট কমিটি।’ গঠন করেন৷ এরপর একাধিক কমিটি গঠন করা হয় কিন্তু বিতর্ক চরমে পৌঁছায় যখন ২০০৫ সালে মহমোহন সিং-এর প্রধানমন্ত্রীত্বের UPA-1 সরকার ‘সেতুসমুদ্রম প্রকল্পে’র অফিসিয়াল সূচনা ঘোষণা করে এই সেতুর একটি অংশ ভাঙার প্রস্তুতি শুরু করে৷ দেশ জুড়ে চরম বিরোধিতা শুরু হয় রাম সেতু ভাঙার৷ বিষয়টি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আরও একটি (পাচৌরী কমিটি) গঠন করে। এই কমিটি স্টাডির পর এই ‘সেতুসমুদ্রম’ পুরো প্রোজেক্টটিকে বাতিল করার পরামর্শ দেয় (ঠিক কী কারণে তা অবশ্য আজও অজানা, সে তথ্য বাইরে আসতে হয়নি অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টের মতো)। এই কমিটির কথা অমান্য করেই তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ‘সেতুসমুদ্রম’ এর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার রাস্তায় হাঁটে৷ সারা দেশে রাস্তায় নামে হিন্দুরা, বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যায়৷ এরপর এক ভয়ঙ্কর দুঃসাহসিক কাজ করে বসলেন কংগ্রেস সরকারের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব৷ প্রধানমন্ত্রীর তরফে একটি রিপোর্ট জমা দেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টে যেখানে সরাসরি বলা রামায়ণ একটি কাল্পনিক গ্রন্থ, রাম কাল্পনিক, তাই রামসেতুর সঙ্গে আস্থার কোনও বিষয় নেই৷ আর শুধু কোর্টেই নয় সেসময় কংগ্রেস শীর্ষ নেতা নেতা কপিল সিবাল সরাসরি এইরকম একটি বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে রাখেন (ইয়ুটিউবে এখনও সিবালের এই বক্তব্যটি পাবেন) তিনি স্পষ্ট বলেন রামায়ণও কাল্পনিক রামও তাই৷ সারা দেশজুড়ে হিন্দুরা প্রতিবাদ শুরু করে৷ ঔদ্ধত্যপূর্ণ কংগ্রেস সরকারের তরফে তৎকালীন আইনমন্ত্রী H R Varadawaz বলেন, ‘রাম ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ’
কোনভাবে সেবারের মতো বেঁচে যায় রাম সেতু৷
এটা তো গেল কংগ্রেসের প্রচেষ্টা, এর আগে কি রামসেতুকে বিভিন্নভাবে নষ্ট করার প্রয়াস হয়নি?
৩৫০০ খীষ্ট্রপূর্বাব্দের বাল্মিকী রামায়ণে সুন্দর কাণ্ডে রামের কৃতক বানর সেনা দ্বারা এই সেতু নির্মাণের পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে৷ গুরুত্বপূর্ণভাবে বাল্মিকী রামায়ণে বলা হয়েছে
এই সেতুটির প্রস্থ ও দৈর্ঘের অনুপাত ১: ১০,
বর্তমানেও ধনুষকোটি ও থালিমান্নারের যে অংশে এই সেতুটি রয়েছে তার দৈর্ঘ প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৩.৫ কিমি অর্থাৎ
১: ১০।। বাল্মীকি রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে যেখানে সেতুনির্মাণের কথা বলা হয়েছে সেখানে ধনুষকোটি সহ একাধিক জায়গার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে৷ রামায়ণ অনুসারে এই সেতু নির্মাণের আগে বেশ কয়েকদিন ধরে পুরো এলাকার তথ্যতালাশ করেছিলেন নল ও নীল। তারা খেয়াল করেছিল পাম্বান থেকে মান্নারের মাঝে একাধিক সমুদ্রে নিমজ্জিত শৈলশিরা ও দ্বীপ রয়েছে৷ এই সমুদ্রনিমজ্জিত দ্বীপ ও শৈলশিরার চূড়াগুলিকে পিলারের মতো ব্যবহার করেই ‘রামসেতু’ নির্মাণ করেছিলেন নল ও নীল৷ এবং সে কারনেই টানা নয় বরং একদিনে একটা ছোট দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপ পর্যন্ত সেতু নির্মাণের বর্ণনা রয়েছে রামায়ণে৷
২০০৭ সালে ISRO র স্পেস অ্যাপলিকেশন সেন্টার (SAC) এর সামুদ্রিক ও জলসম্পদ গোষ্ঠী রিমোট সেন সেনসিং-এর মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন মোট ১০৩ টি প্যাচ রিফ দিয়ে এই সেতু তৈরি৷ জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ‘প্রজেক্ট রামেশ্বরম’ এর মাধ্যমে রেডিকার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে সনাক্ত করেছেন যে
রামেশ্বরম থেকে মান্নার পর্যন্ত এই সেতুর বয়স কাল ৭০০০-১৮০০০ সাল। বিশেষ করে সমুদ্রনিমজ্জিত শৈলশিরা ও দ্বীপগুলি যেগুলি সেতুর পিলার রূপে ব্যবহৃত সেগুলির বয়স অনেক বেশি কিন্তু তার উপরের যে ব্রীজের অংশ ও তার জন্য ব্যবহৃত পাথরের বয়স প্রায় ৭০০০ সাল যা রামের জন্ম ও রামায়ণের ঘটনারই সমসাময়িক৷
এখানে আরও একটা তথ্য দিয়ে দেওয়া জরুরি, ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ ইন বেদ (I-SERVE) প্ল্যানেটারিয়াম সফটওয়্যার ব্যবহার করে রামের জন্ম সময় 5114 BC নির্ধারণ করেছে৷ যা আমাদের সময় থেকে প্রায় ৭০০০ বছর পুরনো৷ জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কার্বনডেটিংয়ের তথ্য অনুসারে রামসেতুর বয়স এবং রামায়ণে ব্রীজের সাইজ ১:১০ বর্ণনা এবং বাস্তবেও রামসেতুর সাইজ ১:১০ হওয়াকে আপনি কাকতালীয় ধরতেই পারেন তবে সেই কতটা সঠিক হবে সেটা নিজেরাই বিচার করুন।
তবে শুধু কংগ্রেস নয় ব্রিটিশরাও রামসেতুর ভোলবদলের চেষ্টা করে গিয়েছে বারে বারে৷
৯১২ সালের সমসাময়িক সময়ে লেখা পারসিয়ান পর্যটক ইবন খেরদাদবেহর বই ‘কিতাব আল মামলিক’ এ এই সেতুকে ‘রামসেতু’/ ‘সেতুবন্ধ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশরা যখন প্রথম ভারতে আসে ও দক্ষিণভারত পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল তখনকার ব্রিটিশদের একাধিক লেখায় এটিকে রামসেতু বলে বর্ণনা করা হয়েছে৷ এরপর হঠাৎ করে ১৮০৪ সালে আদ্রিয়ান রুমি তার ”Placenames of the World’ বইয়ে এটিকে অ্যাডামস ব্রীজ বলে দিলেন, কারণ? বাইবেলে বর্ণীত আদম নাকি আপেল খেয়ে শ্রীলঙ্কায় পড়েছিল তারপর এই ব্রীজ দিয়ে ভারতে এসেছিল! যার উল্লেখ বাইবেল-এই কোথাও নেই! ব্যস শুরু হল রামসেতুকে অ্যাডামসব্রীজ বানানোর প্রচেষ্টা। এখনও গুগলে রামসেতু লিখে সার্চ করুন উইকিপিডিয়া অ্যাডামস ব্রীজ দেখাবে আপনাকে!
ইংরেজ হোক কিংবা কংগ্রেস কিংবা কনিউনিষ্টরা, ভারতের ইতিহাস, সাহিত্য, কৃষ্টিকে এভাবে গুলিয়ে দিয়ে ভুলিয়ে দিয়ে ধ্বংস করে ফেলতে চেয়েছে বারবার। যে রামসেতু ও রামায়ণ গবেষণার বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল, বহু প্রমাণ থাকা পরও সেগুলিকে কাল্পনিক বলে ভাঙার চেষ্টা চলছে৷ কিন্তু পেরেছে কি? ভারত থেকে শ্রীরামকে কিংবা শ্রীরাম থেকে ভারতকে মুছতে পেরেছে কি?
ইকবালের শায়েরীর উল্লেখ করে বলতে হয়,
‘হ্যায় রামকে ওজুদ পে হিন্দুস্থান কো নাজ
এহেল্-এ-নজর সমঝতে হ্যায় উস কো ইমামে হিন্দ।।’
আজ দেখুন সারা ভারতে কোথাও ইংরেজ শাসন নেই, সারা ভারতে কংগ্রেস শাসনও মুছে যাওয়ার পথে, কিন্তু রাম আছেন, রামসেতুও আছে নিজের জায়গাতে৷ রামের ভূমিতে যে রামকে মুছে ফেলতে চাইবে এভাবেই তারা মুছে যাবে, এবং এটা কিন্তু প্রাকৃতিক উপায়েই হবে, কার্বন ডেটিংয়েও যার চিহ্ন থেকে যাবে৷
একমাসে বাঁন্ধা গেল শতেক যোজন
উত্তরের জাঙ্গাল ঠেকিল দক্ষিণ কূলে।।
(- সুন্দর কাণ্ড, কৃত্তিবাসী রামায়ণ)