নয়াদিল্লি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ রবিবার সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের যে বাজেট পেশ করলেন, তাতে মধ্যবিত্তের জন্য আশার আলো নেই বললেই চলে। আয়কর কাঠামোয় কোনও পরিবর্তন না আসায় যেমন সাধারণ মানুষ হতাশ, তেমনই ‘নিরাপত্তা লেনদেন কর’ বা এসটিটি (STT) বৃদ্ধির ঘোষণায় বড়সড় ধস নেমেছে শেয়ার বাজারে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী এই বাজেটকে ‘যুবশক্তির বাজেট’ বলে দণ্ডায়মান করিয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা একে ‘মিথ্যার জঞ্জাল’ এবং ‘জনবিরোধী’ বলে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন।
শেয়ার বাজারে হাহাকার: লগ্নিকারীদের মাথায় হাত
বাজেট বক্তৃতার দেড় ঘণ্টার মাথায় অর্থমন্ত্রী যখনই ‘নিরাপত্তা লেনদেন কর’ (STT) আড়াই গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেন, তখনই দালাল স্ট্রিটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
- কর বৃদ্ধি: ফিউচার লেনদেনে কর ০.০২% থেকে বাড়িয়ে ০.০৫% এবং অপশন লেনদেনে ০.০১% থেকে বাড়িয়ে ০.১৫% করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- সূচকের পতন: ঘোষণার পরই সেনসেক্স এক ধাক্কায় ২,৩০০ পয়েন্টের বেশি পড়ে যায়। নিফটি-৫০ নেমে যায় ২৪,৫৭১ পয়েন্টে।
- আশঙ্কা: বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লগ্নিকারী এবং ব্রোকারেজ ফার্মগুলোর লাভের অঙ্ক কমতে থাকায় এই অস্থিরতা দ্রুত কাটবে না।
মধ্যবিত্তের বঞ্চনা ও অর্থমন্ত্রীর বিড়ম্বনা
এবারের বাজেটে আয়কর ছাড় নিয়ে বড় কোনও ঘোষণা না থাকায় মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। এমনকি মিউচুয়াল ফান্ডের মূলধনী লাভেও মেলেনি কোনও স্বস্তি। সাংবাদিক বৈঠকে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রীকে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে দেখা যায়। তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে চলে যান, যা বিরোধীদের সমালোচনার অস্ত্র হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: ‘মিথ্যার জঞ্জাল’ বনাম ‘বিকশিত ভারত’
বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত কড়া ভাষায় কেন্দ্রকে আক্রমণ করেন।
“এই বাজেট বণিকমহলকে হতাশ করেছে। এটি আসলে ‘গার্বেজ অফ লাই’ (মিথ্যার জঞ্জাল)। বাংলা থেকে সব টাকা নিয়ে যাচ্ছে অথচ রাজ্যকে কিছুই দিচ্ছে না। বকেয়া ২ লক্ষ কোটি টাকা নিয়ে কোনও কথা নেই।” — মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
অন্যদিকে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, বাজেটটি বেকারত্ব, কৃষি সংকট ও উৎপাদন হ্রাসের মতো প্রকৃত সমস্যাগুলোর প্রতি অন্ধ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বাজেটের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, এটি ১৪০ কোটি ভারতবাসীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি বলেন, “সেমিকন্ডাক্টর ও বায়োফার্মার মতো শিল্পকে এই বাজেট দিশা দেখাবে। এটি যুবদের স্বপ্ন পূরণের বাজেট।” কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডাও একে ‘দূরদৃষ্টির বাজেট’ বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- দাম কমল-বাড়ল: মোবাইল, ওষুধ ও চামড়ার পণ্য সস্তা হলেও দামি হচ্ছে বিদেশি ঘড়ি ও মদ।
- ধাতুর বাজারে পতন: বাজেটের দিন সোনা ও রুপোর দামেও বড় পতন লক্ষ করা গিয়েছে। সোনার দাম কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।
- ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্র: এসবিআই ও এইচডিএফসি-র মতো বড় ব্যাঙ্কগুলোর শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদিও ব্যাঙ্কিং উন্নতির জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গড়ার আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রের দাবি অনুযায়ী এটি ‘উন্নয়নের রোডম্যাপ’ হলেও, সাধারণ মানুষের পকেট ও শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য দিনটি ছিল চরম হতাশার।

