সারসংক্ষেপ: মিথ্যার বেসাতি ও সত্যের পুনরুদ্ধার
২০২৩ সালের জুলাই মাসে ‘দ্য ক্যারাভ্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত “Hedgewar’s Great Betrayal” শীর্ষক নিবন্ধটি পড়লে মনে হয়, সাংবাদিকতার মোড়কে ইতিহাস বিকৃতির এক নির্লজ্জ উৎসব চলছে। মাত্র একটি বিতর্কিত এবং আদর্শগতভাবে প্রভাবিত সূত্রকে সম্বল করে ডঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারকে এমনভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা হয়েছে, যেন তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে পিঠ দেখিয়েছিলেন এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে যে সত্য বেরিয়ে আসে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই পাল্টা আখ্যানে একাধিক বিশ্বাসযোগ্য দলিল ও ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে আমরা দেখব—ডঃ হেডগেওয়ার ছিলেন একজন প্রথম সারির বিপ্লবী, যিনি অনুশীলন সমিতির সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে শুরু করে আরএসএস-এর মাধ্যমে জাতি গঠনের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। নেতাজির সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধার, প্রত্যাখ্যানের নয়।
১. নড়বড়ে ভিত্তি: ‘দ্য ক্যারাভ্যান’-এর প্রধান সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা
ক. বালাজি হুদ্দার: এক ভোলবদলানো সাক্ষী
‘দ্য ক্যারাভ্যান’-এর পুরো আখ্যানটি দাঁড়িয়ে আছে ১৯৭৯ সালে ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া’-তে প্রকাশিত গোপাল মুকুন্দ হুদ্দার (বালাজি)-এর একটি লেখার ওপর। সেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, ১৯৩৯ সালে দেওলালিতে ডঃ হেডগেওয়ার নাকি নেতাজির সাথে দেখা করতে অস্বীকার করেন। কিন্তু পত্রিকাটি খুব চতুরতার সাথে হুদ্দারের আসল পরিচয় এবং প্রেক্ষাপটটি পাঠকদের আড়ালে রেখেছে।
১. হুদ্দারের কম্যুনিস্ট রূপান্তর: ১৯৪০ সালের মধ্যেই হুদ্দার ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টিতে (CPI) যোগ দেন এবং ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দলের হয়ে কাজ করেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেডে কাজ করার সময় মার্ক্সবাদী দর্শন তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আরএসএস-এর হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শ থেকে সরে এসে তিনি নিজেকে একজন ‘আন্তর্জাতিকতাবাদী’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এমনকি জঙ্গল সত্যাগ্রহের সময় ডঃ হেডগেওয়ার যখন জেলে, তখন হুদ্দার একটি সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। ডঃ হেডগেওয়ার, যিনি গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এই ঘটনা জানার পর হুদ্দারকে পদ থেকে সরিয়ে দেন। একজন বিতারিত ও আদর্শচ্যুত মানুষের সাক্ষ্য কতটা নিরপেক্ষ হতে পারে?
২. সময়ের অসঙ্গতি: হুদ্দারের ওই লেখাটি প্রকাশিত হয় কথিত ঘটনার প্রায় ৪০ বছর পর এবং ডঃ হেডগেওয়ারের মৃত্যুর ৩৯ বছর পর। ততদিনে হুদ্দার পুরোপুরি কম্যুনিস্ট ভাবাদর্শে দীক্ষিত। তাঁর এই ডিগবাজি খাওয়া রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই তিনি তাঁর প্রাক্তন গুরু ডঃ হেডগেওয়ারকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছেন, যিনি আমৃত্যু তাঁর প্রতি সদয় ছিলেন।
খ. একজন প্রাক্তন ও ক্ষুব্ধ সদস্য কি নিরপেক্ষ হতে পারেন?
‘দ্য ক্যারাভ্যান’ হুদ্দারকে একজন নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা হাস্যকর। হুদ্দার ১৯৩৭ সালে স্পেনে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, জেল খেটেছেন এবং লন্ডনে রজনী পাম দত্তের মতো কম্যুনিস্ট তাত্ত্বিকদের দ্বারা সংবর্ধিত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালে দাঁড়িয়ে, আরএসএস-কে হেয় করা এবং নিজের কম্যুনিস্ট অতীতকে মহিমান্বিত করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। এটি নিছক স্মৃতিচারণ নয়, এটি ছিল সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা।
২. ঐতিহাসিক বাস্তবতা: বিপ্লবী হেডগেওয়ারের অগ্নঝরা দিনগুলি
ক. অনুশীলন সমিতি ও সশস্ত্র বিপ্লব (১৯১০-১৯১৬)
ডাক্তারি পড়ার সুবাদে কলকাতায় থাকাকালীন ডঃ হেডগেওয়ার অনুশীলন সমিতির সংস্পর্শে আসেন। এটি কেবল নামমাত্র সদস্যপদ ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। প্রখ্যাত বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, “১৯১০ সালে মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় হেডগেওয়ার, সাভারকর এবং অন্যান্য মারাঠি যুবকরা আমাদের বিপ্লবী দলে যোগ দিয়েছিলেন।” তিনি গোপনে অস্ত্র ও নিষিদ্ধ বই পাচার করতেন। ‘দ্য ক্যারাভ্যান’ তাঁকে স্বাধীনতা বিমুখ বলে যে দাবি করেছে, তা এই তথ্যের সামনে ধোপে টেকে না।
খ. কংগ্রেস নেতৃত্ব ও কারাবাস (১৯২০-১৯৩০)
১. ১৯২০ সালের নাগপুর কংগ্রেস: ১৯২০ সালে নাগপুরে কংগ্রেসের যে ঐতিহাসিক অধিবেশন হয়, ডঃ হেডগেওয়ার ছিলেন তার অন্যতম সংগঠক। তিনি সেই সময়েই পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি সম্বলিত একটি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, যা কংগ্রেসের মূল নেতৃত্ব তখন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেয় এর ঠিক দশ বছর পর, ১৯২৯ সালে। অর্থাৎ, ডঃ হেডগেওয়ার সময়ের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন।
২. ১৯২১ ও ১৯৩০-এর কারাবরণ: ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। ব্রিটিশ বিচারক তাঁর জবানবন্দিকে “রাজদ্রোহী” আখ্যা দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৩০ সালে জঙ্গল সত্যাগ্রহে অংশ নিয়ে তিনি ফের নয় মাসের জন্য জেলে যান। যিনি দু-দুবার ব্রিটিশের জেলে খেটেছেন, তাঁকে কি স্বাধীনতা বিমুখ বলা সাজে?
৩. হেডগেওয়ার ও বোস: শ্রদ্ধার সম্পর্ক, প্রত্যাখ্যানের নয়
ক. ১৯২৮ কলকাতা কংগ্রেস: সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর
১৯২৮ সালে কলকাতা কংগ্রেসের অধিবেশনে নেতাজি ও ডাক্তারজির মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তাঁরা উভয়েই রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গিকে শ্রদ্ধা করতেন।
খ. ১৯৪০-এর জুন মাসের সেই অন্তিম লগ্ন
‘দ্য ক্যারাভ্যান’-এর দাবির কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয় ১৯৪০ সালের জুনের একটি ঘটনা। ডঃ হেডগেওয়ার তখন মৃত্যুশয্যায়, প্রবল জ্বরে আচ্ছন্ন। ১৮ ও ১৯ জুন ফরওয়ার্ড ব্লকের মিটিং শেষে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ২০ জুন সকালে ডঃ হেডগেওয়ারের সাথে দেখা করতে যান।
কিন্তু ততক্ষণে ডাক্তারজি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, চোখ খোলার শক্তিটুকুও তাঁর ছিল না। তাঁকে জাগানোর চেষ্টা করা হলে নেতাজি বাধা দিয়ে বলেন, তিনি পরে দেখা করবেন। এর ঠিক একদিন পরেই, ২১ জুন ডঃ হেডগেওয়ার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দ্য হিতাভাদা (২৩ জুন, ১৯৪০) এবং মডার্ন রিভিউ-এর মতো তৎকালীন পত্রিকাগুলো এই সাক্ষাতের কথা রিপোর্ট করেছিল। যদি ১৯৩৯ সালে হেডগেওয়ার নেতাজিকে অপমান বা প্রত্যাখ্যানই করে থাকেন, তবে কেন নেতাজি মৃত্যুর দুদিন আগে তাঁর সাথে দেখা করতে ছুটে যাবেন? এই সহজ প্রশ্নটির উত্তর ‘দ্য ক্যারাভ্যান’ এড়িয়ে গেছে।
৪. স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস-এর ভূমিকা
ডঃ হেডগেওয়ার চেয়েছিলেন আরএসএস-কে প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে রেখে সমাজ গঠনের কাজে লাগাতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্য ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা টেকসই হবে না। তাই আরএসএস প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে না জড়ালেও, হাজার হাজার স্বয়ংসেবক ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ভগৎ সিংয়ের সহযোগী রাজগুরুকে নাগপুরে আরএসএস-এর এক নেতার খামারবাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বরাবরই আরএসএস-কে তাদের শাসনের জন্য “বিপজ্জনক” মনে করত। যদি তারা ব্রিটিশের দালালই হতো, তবে ব্রিটিশ প্রশাসন কেন তাদের শাখাকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করত?
৫. ‘দ্য ক্যারাভ্যান’-এর সাংবাদিকতার দেউলিয়াপনা
নিবন্ধটি একপেশে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সমসাময়িক সংবাদপত্রের রিপোর্ট, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর মতো বিপ্লবীদের সাক্ষ্য এবং ব্রিটিশ রেকর্ডগুলোকে এড়িয়ে গেছে। মহাত্মা গান্ধী স্বয়ং ওয়ার্ধায় আরএসএস ক্যাম্প পরিদর্শন করে তাদের শৃঙ্খলার প্রশংসা করেছিলেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও ডঃ হেডগেওয়ারকে “ভারত মায়ের মহান সন্তান” বলে অভিহিত করেছেন। এই সত্যগুলো কি সাংবাদিকতার খাতিরে উল্লেখ করা উচিত ছিল না?
উপসংহার: সত্যের জয় অনিবার্য
ডঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের জীবন কোনো “বিশ্বাসঘাতকতা”র গল্প নয়, বরং এটি এক ত্যাগের মহাকাব্য।
- তিনি ছিলেন অনুশীলন সমিতির সক্রিয় বিপ্লবী।
- ১৯২০ সালেই পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলেছিলেন।
- দুবার ব্রিটিশের জেলে বন্দী ছিলেন।
- নেতাজির সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধার।
‘দ্য ক্যারাভ্যান’ একটি বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাচাতে গিয়ে ইতিহাসের যে বিকৃতি ঘটিয়েছে, তা কোনো গবেষণালব্ধ কাজ নয়, বরং নির্লজ্জ অপপ্রচার। প্রকৃত “বিশ্বাসঘাতকতা” ডঃ হেডগেওয়ার করেননি; করেছে ‘দ্য ক্যারাভ্যান’—সাংবাদিকতার সততা এবং ঐতিহাসিক সত্যের সাথে।
আজ সময় এসেছে, প্রোপাগান্ডার কুয়াশা সরিয়ে এই মহান দেশপ্রেমিককে তাঁর প্রাপ্য সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করার। সত্যের আলোয় মিথ্যা চিরকালই ম্লান হয়ে যায়, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।


