ড. কল্যাণ চক্রবর্তীর প্রতিবেদন// গত ৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫; প্রয়াত হয়েছেন বারাকপুর ভোলানন্দ ন্যাশানাল বিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান তথা শ্রীগুরু ভোলানন্দ আশ্রমের প্রেসিডেন্ট, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, নিবেদিত-প্রাণ কর্মী, অন্তর্মুখী মহাত্মা পূজ্যপাদ স্বামী ভবাত্মানন্দ গিরি মহারাজ। তাঁর সন্ন্যাস গুরু ছিলেন এক কর্মযোগী সন্ন্যাসী তথা বারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অন্যতম শিক্ষা-সংগঠক স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দ গিরি মহারাজ। ভবাত্মানন্দজী দীক্ষাগুরু হিসাবে পেয়েছিলেন স্বামী মহাদেবানন্দ গিরি মহারাজকে যাঁর নামে বারাকপুরে একটি কলেজ আছে, যিনি পরমহংস পরিব্রাজকাচার্য মণ্ডলেশ্বর স্বামী ভোলানন্দ গিরি মহারাজের মন্ত্রশিষ্য ছিলেন। ১৯৮৯ সালে স্বামী জ্যোতির্ময়ানন্দজীর শরীর যাওয়ার পর তিনি ভোলানন্দ আশ্রমের মহন্ত হন, শেষদিন পর্যন্ত তিনি এই গুরু দায়িত্ব সামলেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
বিগত পাঁচের দশকের প্রথমার্ধে বারাকপুর-মনিরামপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীগুরু ভোলানন্দ আশ্রম। আশ্রমের অবয়ব পাবার পর জ্যোতির্ময়ানন্দজী ও কয়েকজন গুরুভ্রাতা মিলে বারাকপুর স্টেশন থেকে পাল্কি করে অশীতিপর গুরুদেব মহাদেবানন্দজী (১৮৭২-১৯৬২)-কে আশ্রমে নিয়ে আসেন আশ্রম মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য। মহাদেবনন্দজী থাকতেন ‘শ্রীশ্রী ভোলানন্দ সন্ন্যাস আশ্রম, হরিদ্বারে। তিনি ভোলানন্দজী মনোনীত আশ্রমের প্রথম প্রেসিডেন্ট।
বিগত ছয়ের দশকে জ্যোতির্ময়ানন্দজীর প্রচেষ্টায় মনিরামপুরে এক অধ্যাপকের বাড়ির উপরের তলায় কয়েকজন শিশুকে নিয়ে সূত্রপাত ঘটে অনাথাশ্রম। পরে সাতের দশকে ব্যারাক রোডে তা নিজস্ব ভবনে উঠে আসে, এতদাঞ্চলে ‘ভোলানন্দ গিরি অনাথ আশ্রম’ নামেই তার পরিচিতি ছিল। পরে অবশ্য বিগত আটের দশকের শেষ দিকে রাজনৈতিক কারণে এই অনাথাশ্রম একরকম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন আশ্রম কর্তৃপক্ষ।
সাতের দশকেই ভোলানন্দ আশ্রমে যোগদান করেন স্বামী ভবাত্মানন্দজী মহারাজ। ১৯৬৮ সালে জ্যোতির্ময়ানন্দজী মনিরামপুরে প্রতিষ্ঠা করেন পরমারাধ্য গুরুদেব স্বামী মহাদেবানন্দজীর স্মৃতিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মহাদেবানন্দ কলেজ’, এটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত। পূর্বে এই কলেজ পরিচালিত হত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয় ‘ভোলানন্দ জাতীয় বিদ্যালয়’। বিদ্যালয়টি CBSE দ্বারা স্বীকৃত। বর্তমানে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে NIOS বা National Institute of Open Schooling-এর সুযোগও রয়েছে, যেখানে ক্লাস টেন এবং ক্লাস টুয়েলভে পরীক্ষায় বসা যায়। আশ্রমের তত্ত্বাবধানে উত্তর ২৪ পরগণার কাঁকিনাড়ায় চলে ‘ভোলানন্দ ন্যাশানাল একাডেমি’। এই সব সেবাকাজ ও অধ্যাত্ম-সাধনা নিয়েই ছিল স্বামী ভবাত্মানন্দজীর ভবের সংসার।
ভোলানন্দ আশ্রমের ছত্রছায়াতে বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল শিক্ষা সম্প্রসারণের এক মহতী উদ্যোগ। জ্যোতির্ময়ানন্দজীকে বিগত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এলাকার মানুষ ভগবানতুল্য, কর্মযোগী হিসাবে মনে করতেন। প্রথাগত শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার পাশাপাশি শুরু হয় অনাথাশ্রম। তাঁরই শিক্ষাভাবনাকেই পরবর্তীকালে প্রবাহিত করে চলেছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্য স্বামী ভবাত্মানন্দজী। প্রায় ১.৯৮ একরের আশ্রম প্রাঙ্গণে রয়েছে ‘স্বামী মহাদেবানন্দ গিরি বৃদ্ধাশ্রম’ যেখানে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা গৃহের সম্ভাব্য কঠিন পরিবেশের পরিবর্তে পেয়ে থাকেন নিরাপদ ও আনন্দময় আশ্রয়৷ ভবাত্মানন্দজীর অভিভাবকত্বে চলছিল সেবাকাজ। জানা যায় তিনি পূর্বাশ্রমে ছিলেন খড়দহের শ্যামসুন্দর মন্দিরের সেবাইত বংশের হালদার পরিবারের সন্তান। কোনো প্রচার প্রসার ব্যতিরেকে একরকম গুপ্তভাবেই তিনি আশ্রমজীবন অতিবাহিত করতেন। আশ্রম-নিবেদিত প্রাণ ছিলেন তিনি; দৈনন্দিন পূজার্চনা, হেঁসেল সামলানো, ভাঁড়ার ঘরের দায়িত্ব, গোয়ালঘরের কাজ, ধোয়ামোছা সবই একসময় নিজের হাতে অনায়াসে করেছেন। স্কুলে বা আশ্রমের সকল আশ্রমিক ও ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন কাছের মানুষ, ‘আপন মহারাজ’। তাদের সকলের দাবী থাকতো এই ‘ছোটো মহারাজে’র উপরই। ‘বড় মহারাজ’ স্বয়ং জ্যোতির্ময়ানন্দজী ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তাই পুজোর প্রসাদ, দরবেশ, পান্তুয়াটা চাওয়ার সুযোগ ছিল ছোটো মহারাজ বা ‘নতুন মহারাজে’র কাছেই। আশ্রমের প্রথম দিকের ছাত্রেরা ‘বুলু মহারাজ’ বলে ডাকতেন। ‘বুলু’ তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম। পরে বয়সজনিত কারণে তাঁর শরীর ভেঙে গেলেও তিনি ধাত্রীর মতো ধরে রেখেছিলেন আশ্রমের প্রাণকেন্দ্রকে। শেষ দুর্গাপূজায় তিনি সশরীরে মন্দিরে যেতে বা বসতে পারেন নি, কিন্তু ছাদের ঘর থেকে বসে সমস্ত কাজ নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেছেন এবং পূজা ও মন্ত্রপাঠ শুনেছেন। তাঁর ভক্তমণ্ডলীর অনেকে বলছেন, তিনি শতায়ু হয়েই ব্রহ্মলীন হয়েছেন। এদিন (৮ ই ডিসেম্বর) দ্বিপ্রহর ২:৫৫ মিনিটে তাঁকে মনিরামপুর শ্মশানে দাহ করা হয়৷ আশ্রম ও শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন বহু ভক্ত, শিষ্য, সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী এবং তাঁর গুরুভ্রাতাগণ। সকলেরই কথা আশ্রমের বিপুল ক্ষতি হয়ে গেল।
তথ্য সহায়তা: সুব্রত সেনগুপ্ত, মনিরামপুর, বারাকপুর; প্রতিপ অধিকারী, কালীঘাট, কলকাতা; সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, খড়দহ।


