বড়দিনই বটে !

১৮৮৬ সালের ২৫ শে ডিসেম্বরের ঠিক আগের রাত।
স্থান- বরানগর মঠ , কলকাতা।
শ্রী রামকৃষ্ণের ভাবামৃত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে সন্ন্যাসব্রত গ্ৰহণ করলেন নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর গুরু ভাইয়েরা।
অন্ধকারে নিমজ্জিত ও আত্মগ্লানিতে বিদ্ধ হাজার বছরের সংস্কৃতি কে নবজাগরিত করতে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বেন তাঁরা।

পরাধীন ভারতবর্ষ কে মুক্ত করতে শত শত বিপ্লবীর ও সমাজ সংস্কারকদের প্রেরণা হবেন তাঁরা।
আর্থিক , শারিরীক ও মানসিক কষ্ট কে উপেক্ষা করে এক বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞার জন্ম হলো আজ।

১৮৯২ সালের ২৫ শে ডিসেম্বর।

স্থান-কন্যাকুমারী।

উত্তাল সমুদ্র কে উপেক্ষা করে প্রায় ৫০০ মিটার সাঁতরে উঠলেন এক শিলাখন্ডে।
ধ্যানস্থ হলেন।
একে একে পার হয়ে গেলো টানা তিনদিন — ২৫ , ২৬ , ২৭।
খুঁজে পেলেন তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য , ভারতবর্ষের অধ্যাত্মসম্পদ কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার জন্য প্রতিজ্ঞা করলেন— ভারতবর্ষের পরমবৈভবশালী হওয়ার পথ দেখতে পেলেন।
পুঁথিগত বিদ্যা না থাকা সত্ত্বেও , ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সহজ সরল, সাধারণের সহজবোধ্য ভাষায় বেদান্তের শিক্ষা নরেন কে কিভাবে প্রভাবিত করেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক ঠাকুর কে অবতার রূপে মেনে নেননি। শ্রীরামকৃষ্ণের পরীক্ষা নিয়েছিলেন, তারপরেই শিষ্যের মন থেকে গুরু সম্পর্কে সমস্ত সন্দেহ দূর হয়।
ঠাকুরের কাছে নরেনের সরাসরি প্রশ্ন ছিল ‘আপনি ঈশ্বর দর্শন করেছেন?’। শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিয়েছিলেন তিনি নিজে দেখেছেন এবং দেখাতেও পারেন। এতদিনে নরেনের মন দীর্ঘ প্রতিক্ষিত প্রশ্নের উত্তর পেলেও মন ঈশ্বর দর্শনের জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলো।
শ্রীরামকৃষ্ণের সাহচর্যে নরেনের মনে বিশ্বাস জাগলো যে , শুধুমাত্র বই পড়ে ধর্ম শিক্ষা সমাপ্ত হয় না। বই এর সাহায্যে আমাদের চিন্তা শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটে। ঈশ্বর আছেন হয়তো সে উপলব্ধি জাগে, কিন্তু ঈশ্বর লাভ করতে গেলে সাধনা দরকার। শ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন ধরনের সাধন-ভজন করতে লাগলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে সমাধি-লাভ কি করে করতে হয় , নরেন্দ্র জানলেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন কে হেসে বলেছিলেন ” তোমার কাছে একটা চাবি দেওয়া থাকলো , সমস্ত কাজ শেষ হলে তুমি আবার সমাধিলাভ করবে”।
ঠাকুর বললেন “সমাধি তো আছেই ,সমাধি তোমার কাছে কৃচ্ছকথা। এখন সর্বভূতে ঈশ্বর আছে জেনে মানুষের সেবা করো, কাজ শেষ হলে আবার সমাধিমগ্ন অবস্থায় ফিরে যাবে।
ঠাকুরের ইচ্ছামতো ঈশ্বরলাভের আশায় চঞ্চল নরেন “শিব জ্ঞানে , জীব সেবায়” স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে উঠলেন।
তখন ভারতবর্ষের বুকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জয়পতাকা উড্ডিন হয়েছে। ব্রিটিশ আর খ্রিস্টান মিশনারীর আক্রমণে হিন্দু ধর্মের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।যেহেতু খ্রিস্টধর্ম তখন রাজধর্ম খ্রিস্টান হলে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে আর খ্রিস্টীয় মিশনারী নানারকম প্রলোভনে যুবকরা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হচ্ছেন। মনে হচ্ছে হিন্দু ধর্ম আর হয়তো অবশিষ্ট থাকবে না।
সেই যুগ-সন্ধিক্ষণে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের আবির্ভাব শুধু ভারতবর্ষের নয় , সমগ্ৰ বিশ্বের কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

স্বামী বিবেকানন্দ পারতেন আপন আধ্যাত্মিক সাধনায় আরো এগিয়ে গিয়ে জন্ম-মৃত্যুর চক্র পেরিয়ে মোক্ষলাভের পথে এগিয়ে যেতে — একজন সন্ন্যাসীর যা লক্ষ্য থাকে। কিন্তু তার সামনে ছিল শঙ্করাচার্যের ইতিহাস, সমর্থ রামদাসের ইতিহাস, স্বামী বিদ্যারণ্যের ইতিহাস।
বৈদেশিক আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে ভারতে যখন মঠ-মন্দির ধ্বংস হচ্ছে তখন রাজা আর সন্ন্যাসীর যুগলবন্দী ভারতকে রক্ষা করেছে , যখন তর্কের মাধ্যমে আপন মত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল তখন ভারত ভ্রমণ করার প্রয়োজন ছিল। আর যখন ভারত হাজার বছরের পরাধীনতা ভোগ করে আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে, কুসংস্কার ছড়িয়েছে তার সমাজব্যবস্থায় তখন ভারতের উদ্ধারে তাঁর কি লক্ষ্য হতে পারে?
স্বামী বিবেকানন্দ বোঝালেন যখনই ভারতের দুর্দিন এসেছে তখনই ভারত তাঁর প্রাণপাখি টিকে বলিষ্ঠ করার চেষ্টা করেছে। প্রাণপাখি, তার ‘ধর্ম’ । বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উপাসনা পদ্ধতির মধ্যে যে সংঘর্ষ আর জোরপূর্বক অত্যাচারের মাধ্যমে আপন মত প্রতিষ্ঠার যে রক্তাক্ত ইতিহাস রয়েছে তাকে পাল্টাতে পারে একমাত্র বেদান্তের কালজয়ী গভীর তত্ত্ব। বিশ্বকে বেদান্ত দেওয়াই ভারতের উদ্দেশ্য ও কর্তব্য। বাকি সব আপনা থেকেই হবে — স্বাধীনতা, সমাজ সংস্কার , বিশ্বশান্তি।
এই উপলব্ধিই হয়েছিল সেই ২৫ ডিসেম্বর শুরু করা ধ্যানে।
বাকিটা স্বমহিমায় পৃথিবীর ইতিহাসে আলোচনা ও গবেষণা হয়ে আসছে।

পরের বছর অর্থাৎ ১৮৯৩ সালের ১১-২৭ সেপ্টেম্বর ভারতবর্ষের বাণী ধ্বনিত হলো বিশ্বমঞ্চে।
বিবেকানন্দ নিজেকে বিশ্বের প্রাচীনতম সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বললেন, বেদের মহিমা কীর্তন করলেন , পৃথিবীর মানুষ কে যারা বিশ্বাসী – অবিশ্বাসী হিসেবে ভাগ করে পৃথিবীর ইতিহাস কে রক্তাক্ত করেছে তাদের ধিক্বার জানালেন নিজের সুললিত বক্তব্যে। শোনালেন কুঁয়োর ব্যাঙের গল্প— প্রকারান্তরে বললেন একটিমাত্র বইয়ের মধ্যেই দুনিয়াকে না দেখে বিশাল শাস্ত্রসম্ভারের সমুদ্রে যেতে, দৃষ্টিকে আরো বৃহৎ করতে।
মানবজাতির ভবিষ্যত কোনো ‘Original Sin’ এর দায় বহন করার জন্য নয় বরং মানবশিশু প্রত্যেকেই অমৃতের সন্তান, বীর্যদীপ্ত হয়ে আপন জীবনদীপ কে মানবসভ্যতার কল্যাণে নিয়োজিত করাই তার কর্তব্য, তার জন্মগ্ৰহণের উদ্দেশ্য।
মানবজাতির উদ্ধার কেবল কোনো ‘Dogma’ , কোনো মতবাদের উপর বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল নয় বরং আপন জীবনের স্বার্থকতার জন্য সমস্ত পরাধীনতাকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র আপন আধ্যাত্মিক অনুভবের পথে নির্ভীকভাবে অগ্ৰসর হওয়াই Salvation পর রাজপথ।

ভারতবর্ষের আত্মবিশ্বাস জাগ্ৰত হলো।
ষড় রিপুর বন্ধনকেও ভেঙে ফেলাই যাদের আধ্যাত্মিক লক্ষ্য সেই ভারতবাসী কিভাবে ভারতমাতার পরাধীনতায় চুপ করে থাকবে? পরাধীনতার বন্ধন মোচন করতে শয়ে শয়ে যুবক এগিয়ে এলো।

সৃষ্টিতত্ত্বের প্রাচীনতম যুক্তিগ্ৰাহ্য ব্যাখ্যা সামনে রেখেছে যে ধর্ম, তার অনুসারীরা জানে বিশ্বের সৃষ্টি ৬ দিনে হয় নি আর সপ্তমদিনে ঈশ্বর কে বিশ্রাম নিতেও হয় নি। ‘Judgement Day’ পর্যন্ত মুক্তির জন্য অপেক্ষা করারও প্রয়োজন নেই, তারা বিবেকানন্দের মুখেই শুনলো উপনিষদের ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’র নবীন সংস্করণ – ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’।
দেশবাসী রামকৃষ্ণ মিশনের উদ্যোগে সেবাযজ্ঞে নেমে পড়লো , আত্মবিস্মৃত জাতি নিজের ইতিহাস জানতে সচেষ্ট হলো , ভারতবোধ জাগ্ৰত হলো।

কন্যাকুমারী তে নিজের তিনদিনব্যাপী ধ্যানে যে নির্দেশ পেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ তা সম্পূর্ণ হলো।

ভারতবর্ষের জন্য এ তো সত্যিই বড়দিন!

পিন্টু সান্যাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.