তখন সমাজে তাঁর পরিচয় এমনতরো — “রেতেদিনে মদ্যপানে বড়ই সন্তোষ।/হাটে বাটে রটা নাম শ্রীগিরিশ ঘোষ।।” অনেক কথা যুক্তি দিয়ে বলতে পারেন তিনি, তর্কেও অসামান্য পারদর্শী, কাউকে পরোয়া করেন না। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের সামীপ্যে প্রথম এলেন ১৮৭৭ সালে বসুপাড়ায় দীননাথ বসুর বাড়িতে। কোনো সামান্য ব্যক্তি নন তিনি, “বীরভক্ত শ্রীগিরিশ চুনাপুঁটি নয়।/প্রথম দর্শনে এইতক পরিচয়।।” এরপর বলরাম-মন্দিরে দ্বিতীয় দর্শন। ঠাকুরের মধুর কথা শুনলেন “বসিয়া শুনিল কথা প্রভু বিদ্যমান।/শ্রীগিরিশচন্দ্র ঘোষ তার্কিক-প্রধান।।” লোকশিক্ষক শ্রীরামকৃষ্ণ ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছেন, গিরিশের চিত্তহর অভিনয়ের কথা, দর্শক-শ্রোতাকে মাতোয়ারা করে রাখার অদ্ভুত ক্ষমতার কথা। মঞ্চমধ্যে যখন তিনি অভিনয় করেন, যেন অবিকল সেই চরিত্রের ব্যক্তিটিই আবির্ভূত হন তাঁর মধ্যে। মঞ্চে ষোলোআনা আধিপত্য।
অভিনয় বলে প্রত্যয়ই হয় না! এমনই অভিনেতা, এমনই প্রখ্যাত নাট্যকার। “মহাবলী বীর-ভক্ত প্রভুর আমার।/ শ্রীগিরিশ ঘোষ নামে এই নাট্যকার।” গিরিশ রচিত চৈতন্য-লীলা দেখতে মানুষের ঢল নামে। তাতে মনোমুগ্ধকর গান গুলি যেন ভক্তি আর প্রেমের আকর হয়ে ওঠে। খাওয়া জুটুক, আর না জুটুক, চৈতন্য-লীলার জন্য দর্শক রীতিমতো কড়ি জমিয়ে রাখে। মঞ্চমাঝে ভক্তিমাখা লীলাগীত শুনে তাদের দিবস-যামিনী কেটে যায়। এমন কী পথঘাটে বালক-বালিকারা চৈতন্য-লীলার গানগুলি গেয়ে খেলে বেড়ায়। বেশ্যারা তার নাগরকে টপ্পার বদলে গৌরগীত শোনায়। দোকানী বণিকও ব্যবসার ফাঁকে গেয়ে ওঠে সেই গান। দ্বারে দ্বারে ঘুরে এই গান গেয়েই ভিখারি ভিক্ষা করে, “গোউর-ভকতে উঠে আনন্দ অপার।/ শুনিয়া চৈতন্য-গীত মুখে যার তার।” অভিনয়ে লোকশিক্ষাও যে প্রভূত পরিমাণে হয়, শ্রীরামকৃষ্ণ বিশ্বাস করেন। আর এই সেই অভিনেতা, যাঁর সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক রয়েছে মহেন্দ্রের সঙ্গে, অতএব তাঁরই মাধ্যমে খবর পাঠালেন শ্রীরামকৃষ্ণ, তিনি সপার্ষদ মঞ্চালয়ে যাবেন, “সমাচার পাঠাইল তাঁহার সদন।/মঞ্চমধ্যে শ্রীপ্রভুর শুভ আগমন।” ১৮৮৪ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর, ‘চৈতন্যলীলা’ অভিনয়ের সুখ্যাতি শুনে শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তসঙ্গে থিয়েটারে উপস্থিত হলেন। গিরিশের এই তৃতীয় দর্শনে কৃপা করলেন প্রভু। শুরু হল অহৈতুকী কৃপা বর্ষণের এক নতুন অধ্যায়। আধুনিক ভারতের মঞ্চাভিনয়ে শিষ্টসমাজের মননে অভিনেতারা স্থান পেতে শুরু করলেন। আজ যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অভিনেতাদের এনে নেতার আসন দিচ্ছেন, এই সম্মান প্রথম দিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। গিরিশ ঘোষ সেই পরিবর্তিত আধুনিক নাট্যজগতে প্রথম অভিনেতা-সম্মানে পুরস্কৃত ব্যক্তি — সে এক দিব্য পুরস্কার! সে এক ঐশী পুরস্কার-অর্পণের কার্যক্রম! শ্রীরামকৃষ্ণ-পার্ষদ হয়ে গেলেন নাট্যকার গিরিশ ঘোষ। ঠাকুর তাঁর বকলমা -ও নিলেন।
তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-পুঁথি’ পাঠ করে লিখলেন ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
2026-03-01

