টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে ফের নতুন বিনিয়োগের আলোচনা শুরু রাজ্য সরকারের, সিঙ্গুরের আর্থিক দায়ের দায় নিয়ে প্রশ্ন শিল্পমন্ত্রীর

টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে ফের নতুন বিনিয়োগের আলোচনা শুরু রাজ্য সরকারের, সিঙ্গুরের আর্থিক দায়ের দায় নিয়ে প্রশ্ন শিল্পমন্ত্রীর

সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প ঘিরে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের স্মৃতি কাটিয়ে টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে বিনিয়োগের পথ সুগম করতে উদ্যোগী হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যে টাটাদের ফের নতুন প্রকল্পে আগ্রহী করে তুলতে নবান্নের তরফে নতুন করে আলোচনা শুরু করা হয়েছে।

রবিবার রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানান, টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্য সরকারের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে শুধুমাত্র গাড়ি শিল্পেই সীমাবদ্ধ না থেকে, টাটাদের অন্যান্য ব্যবসায়িক ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ এবং নতুন ইউনিট গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

অটোমোবাইলের বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রে নজর রাজ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, ধাতু, আতিথেয়তা এবং খুচরো ব্যবসার মতো একাধিক ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে টাটা গোষ্ঠীর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। সেই প্রসঙ্গে উল্লেখ করে শিল্পমন্ত্রী বলেন, “টাটার সঙ্গে আমরা যোগাযোগে আছি। কথাবার্তা চলছে, যাতে ওদের আনা যায়। ওদের শুধু অটোমোবাইল নয়, তার বাইরেও অনেক ব্যবসা রয়েছে। সেই সব ব্যবসা যদি ওরা সম্প্রসারণে যায় এবং নতুন ইউনিট খোলে, সে বিষয়গুলি দেখা হচ্ছে।” তবে ঠিক কোন ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ হতে পারে, সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

সিঙ্গুরের বকেয়া দায় ও তৎকালীন আন্দোলন বর্তমানে বিনিয়োগের আলোচনা চললেও সিঙ্গুর প্রকল্পের পটভূমি এবং সেখান থেকে উদ্ভূত আর্থিক দায়ভারের প্রসঙ্গটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ২০০৬ সালে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তীব্র জমি আন্দোলনের জেরে ২০০৮ সালের অক্টোবরে সিঙ্গুর থেকে ন্যানো কারখানা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় টাটা মোটরস।

পরবর্তীতে এই প্রকল্প সংক্রান্ত বিবাদে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর একটি সালিশি ট্রাইবুনাল পশ্চিমবঙ্গ শিল্প উন্নয়ন নিগমকে (WBIDC) নির্দেশ দেয় যে, টাটা মোটরসকে ৭৬৫.৭৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, সঙ্গে যুক্ত হবে বার্ষিক ১১ শতাংশ হারে সুদ।

এই বিপুল আর্থিক বোঝা প্রসঙ্গে তৎকালীন রাজ্য নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বলেন, “টাটা ন’শো কত কোটি টাকা দাবি করেছিল। তার সাড়ে সাতশো কোটি টাকা দিতে হবে, সঙ্গে সুদ। এই সমস্ত চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। সেটা তো কোর্টের অর্ডার। তাই এ সব বিষয় নিয়ে তো আমাদের ভাবনাচিন্তা করতে হবে।” তবে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কীভাবে মেটানো হবে, তা এখনই প্রকাশ্যে জানানোর সময় আসেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শিল্পমহলের নজর উল্লেখ্য, সালিশি ট্রাইবুনালের ওই রাযের বিরুদ্ধে তৃণমূল সরকারের আমলেই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগম। একদিকে অতীতে আইনি বিতর্ক ও বিপুল আর্থিক দায়, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ— এই দ্বিবিধ পরিস্থিতিতে টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্য সরকারের এই বর্তমান আলোচনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। শিল্পমহলের দৃষ্টি এখন একটাই প্রশ্নে— এই আলোচনা বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হয় এবং রাজ্যে টাটা গোষ্ঠীর নতুন কোনও বড় প্রকল্প আসে কি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.