ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে শুধু অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করে এসেছেন তিনি। পাঁচ বছর আগে ‘বছরের বেস্ট’ সন্ধ্যার মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের পাকা চুল ও দাড়িকে ইঙ্গিত করে রসিকতার সুরে বলেছিলেন, ‘‘আমিও কিন্তু বাঁধ ভাঙি।’’ তবে চলতি বছরের ওই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘পরিবর্তন’ শব্দটি উচ্চারণের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক শোনাল বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অভীক সরকারকে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে অভীক সরকার বলেন, ‘‘পরিবর্তনের কথা বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু বলব না। শব্দটা ব্যবহার করলেই অনেকে মনে করতে পারেন যে, আমরা একটা রাজনৈতিক পক্ষ নিচ্ছি।’’ তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, অত্যন্ত সযত্নে এই অনুষ্ঠানকে সর্বদা রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। নিজের এক সহকর্মীর বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে তিনি একে বর্ণনা করেন— ‘এক মঞ্চ, সব পক্ষ’ হিসেবে।
তবে অনুষ্ঠানের মঞ্চকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখলেও, এ রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি যে একজন পরিবর্তনকামী, তা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি ৮১ বছর বয়সী এই ব্যক্তিত্ব। প্রারম্ভিক বক্তৃতায় তিনি মন্তব্য করেন, ‘‘এটা তো ঠিক, রাজ্যে একটা বিশাল পরিবর্তন এসেছে। আবার একটা আশার আলো এসেছে। ঠিক যেমনটা এসেছিল ২০১১ সালে।’’ তাঁর মতে, ‘বছরের বেস্ট’ সন্ধ্যার এই মঞ্চ আসলে বাঙালির সেই চিরন্তন পরিবর্তনের স্পৃহাকেই উদ্যাপন করছে।
প্রতি বছরের মতো এবারও এই অনুষ্ঠান বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োজিত ও ভিন্ন মতাদর্শের গুণীজনদের এক মঞ্চে এনেছে। তাঁদের হাতে সম্মান তুলে দেওয়ার আগে রাজ্যের বুদ্ধিজীবী মহলের ভূমিকা নিয়ে নিজের ক্ষোভ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন অভীকবাবু। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘‘প্রতিবাদ বাঙালির জীবনে নেই। অনেক দিন থেকেই নেই।’’
এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, বিশ্বজুড়ে সাধারণত শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণিই প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন এবং আদর্শগত অবস্থান যাই হোক না কেন, তাঁরা মূলত প্রতিষ্ঠানবিরোধী হন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বাম জমানা থেকেই এই চিত্রে বদল লক্ষ্য করেছেন তিনি। তাঁর পর্যবেক্ষণ, সিপিএমের আমলে শিক্ষিত-বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের প্রতিবাদের ভাষা আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে গচ্ছিত রেখেছিলেন। আবার তৃণমূলের জমানায় এসে তাঁদের প্রায় সকলেই শাসকদলপন্থী হয়ে উঠেছেন। দু’-একটি ব্যতিক্রমী চরিত্র ছাড়া এ রাজ্যের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই সবসময় সরকারপন্থী ভূমিকা পালন করেছেন, তা সে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন।
বুদ্ধিজীবী মহলের এই মেরুদণ্ডহীনতাকে ‘ঘোর অমাবস্যা’ বা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করলেও, এর মধ্যেও আশার আলো দেখছেন অভীক সরকার। তিনি বলেন, ‘‘এই ঘোর অমাবস্যায় কিছু আলোর ঝিলিক আছে। আজকের সন্ধ্যায় এরকম কয়েক জনের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।’’ তবে শুধুমাত্র আলোর সামান্য ঝিলিকেই যে তিনি সন্তুষ্ট নন, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রবীণ বয়সেও এক তরুণ যোদ্ধার মতো সাহস ও উদ্যম নিয়ে মাও সে তুঙের (মাও জ়ে দং) বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করে অভীক সরকার বলেন, ‘‘একটা স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল হতে পারে। সেই দাবানলের আশায় আমরা আজকের অনুষ্ঠানকে উৎসর্গ করছি।’’

