আজ থেকে দীর্ঘ ১৮ বছর আগে লিওনেল মেসি কি একবারের জন্যও ভেবেছিলেন যে, পরম স্নেহে যে কোলের শিশুকে তিনি বাথটাবে স্নান করাচ্ছেন, একদিন সেই ছেলের বিরুদ্ধেই বিশ্ব ফুটবলের মহাযুদ্ধে নামতে হবে তাঁকে? সময়ের এক অদ্ভুত পরিহাসে আজ সেটাই বাস্তব। আগামী রবিবার বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হতে চলেছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। আর এই ফাইনালের হাত ধরেই ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী থাকতে চলেছে দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকা— লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালের দ্বৈরথের। আর এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগেই বারবার ফিরে আসছে ১৮ বছরের পুরোনো এক সোনালী স্মৃতি।
বাথটাবের সেই ঐতিহাসিক মোলাকাত
আন্তর্জাতিক মঞ্চ বা ক্লাব ফুটবলের জার্সিতে এর আগে কখনও একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নামেননি মেসি ও ইয়ামাল। অথচ ১৮ বছর আগে তাঁদের প্রথম সাক্ষাতের গল্পটি ছিল একেবারেই অন্যরকম। মাঠে ফুটবল পায়ে প্রতিপক্ষ রক্ষণকে শাসন করলেও, সেদিন কিন্তু একরত্তি ইয়ামালকে সামলাতে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছিল তরুণ মেসিকে। তবে তা সবুজ মাঠে নয়, ছিল জলভর্তি এক বাথটাবে।
২০০৮ সালের সেই দিনটিতে মাঠের লড়াইয়ের কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। ২০ বছর বয়সী মেসি তখন বিশ্ব ফুটবলে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছেন, আর ইয়ামাল তখন মাত্র কয়েক মাসের এক শিশু। চলতি বিশ্বকাপে ইয়ামাল যখন স্পেনের তারকা হয়ে বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন, ঠিক তখনই আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠার পর সমাজমাধ্যমে ১৮ বছর আগের একটি ঐতিহাসিক ছবি নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বছর কুড়ির তরুণ মেসি অত্যন্ত যত্নে বাথটাবে বসানো শিশু ইয়ামালকে স্নান করাচ্ছেন।
ক্যামেরার পিছনের গল্প: লাজুক মেসি ও অপ্রস্তুত মুহূর্ত
ছবিটি যিনি তুলেছিলেন, সেই তৎকালীন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট সংবাদ সংস্থা ‘এপি’-র হয়ে কাজ করার সময়কার সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। তিনি বলেন:
“মেসির বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। ও ভীষণ লাজুক প্রকৃতির ছিল। হঠাৎ ওকে লকার রুমে নিয়ে যাওয়া হলে ও দেখে যে, সেখানে একটি জলভর্তি বাথটাব এবং তার মধ্যে একটা ছোট বাচ্চা খেলছে। মেসি প্রথমটায় সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। অতটুকু বাচ্চা কী করে কোলে তুলে ধরবে, তা ও বুঝতেই পারছিল না।”
বার্সেলোনার ঘরের মাঠ ক্যাম্প ন্যু-তে একটি দাতব্য (চ্যারিটি) কর্মসূচির অংশ হিসেবে বার্সেলোনা ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে এই ফটোশুটের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে লটারির মাধ্যমে সুযোগ পেয়েছিল ইয়ামালের পরিবার। আর সেখানেই মেসির সঙ্গে প্রথম মোলাকাত হয় আজকের স্প্যানিশ সেনসেশনের।
রবিবাসরীয় মহারণে মুখোমুখি দুই প্রজন্ম
আজকের দিনে সেই ছোট্ট ইয়ামালই বার্সেলোনা এবং স্পেনের জাতীয় দলের প্রধান আক্রমণের অস্ত্র। চলতি বিশ্বকাপে মাত্র ১টি গোল করলেও মাঠে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে প্রতিনিয়ত ত্রাস সৃষ্টি করেছেন তিনি, বিশেষ করে সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অনবদ্য।
অন্যদিকে, ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও নিজের চেনা ছন্দে ফুটবল বিশ্বকে মোহিত করে চলেছেন লিওনেল মেসি। ইতিমধ্যেই চলতি টুর্নামেন্টে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল জেতার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন তিনি। তবে কেরিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসে আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের পথে মেসির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন ১৮ বছর আগে তাঁরই হাতে স্নান করা সেই ছোট্ট শিশু লামিন ইয়ামাল। রবিবারের ফাইনালে এই দুই প্রজন্মের লড়াই দেখতে এখন মুখিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব।

