বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের সই জাল করার মামলায় নতুন মোড়। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মূল এফআইআর-টি (FIR) খারিজের আর্জি জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকারকে নোটিস জারি করল আদালত। আগামী সপ্তাহে বিচারপতি কৌশিক চন্দের এজলাসে এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে এবং সেখানে রাজ্য সরকারের বক্তব্য শুনবে আদালত।
মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিষেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ
তৃণমূল কংগ্রেসের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করে বিধানসভার স্পিকারের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, ওই চিঠিতে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল বা কারচুপি করা হয়েছে। চিঠিটিতে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষর থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়।
পরবর্তীকালে ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তের দায়িত্বভার রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইডি-র (CID) হাতে তুলে দেওয়া হয়। সিআইডি এই তদন্তের স্বার্থে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদও করেছে।
এর আগে সিআইডি-র পাঠানো নোটিসকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিষেক এবং আদালত তাঁকে আইনি রক্ষাকবচও দিয়েছিল। তবে এবার সরাসরি মূল এফআইআর-টিই বাতিলের দাবিতে মামলা করেছেন তিনি। আদালতে অভিষেকের পক্ষে সওয়াল করছেন বিশিষ্ট আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য।
দুই বিধায়কের অভিযোগ ও বিরোধী দলনেতা পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব
বিধানসভার স্পিকারের কাছে দেওয়া চিঠিতে সই কারচুপির বিষয়টি প্রথম সামনে আনেন তৃণমূলের টিকিটে জয়ী দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা। তাঁরাই প্রথম স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। এরপর বিধানসভা কর্তৃপক্ষের তরফে থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়।
এই ঘটনার পর ঋতব্রতের নেতৃত্বে জয়ী বিধায়করা স্পিকারকে একটি পৃথক চিঠি দেন। তার ভিত্তিতে স্পিকার রথীন্দ্র বসু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বিধানসভার আনুষ্ঠানিক বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করেন।
তবে স্পিকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আবার হাইকোর্টে পৃথক মামলা দায়ের করেছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বিচারপতি শম্পা সরকারের বেঞ্চ ইতিমধ্যে স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই আইনি টানাপোড়েনের মাঝেই এবার অভিষেকের এফআইআর খারিজের মামলায় রাজ্যকে নোটিস দিল আদালত।
ভাঙনের মুখে তৃণমূল: সংসদ ও বিধানসভায় জোরালো ধাক্কা
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ জয়ী বিধায়ক বর্তমানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিয়েছেন এবং তাঁরা দলটির উপর থেকে কালীঘাটের (মমতা-অভিষেক) কর্তৃত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের চেয়ারপার্সন পদ থেকেও অপসারণ করেছেন এই বিক্ষুব্ধ বিধায়করা।
বিধানসভার পাশাপাশি সংসদের দুই কক্ষেও তৃণমূলের ভাঙন স্পষ্ট:
- লোকসভা: দলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ ইতিমধ্যে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির জোটসঙ্গী ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-তে যোগ দিয়েছেন।
- রাজ্যসভা: উচ্চকক্ষ থেকেও একের পর এক সাংসদ পদত্যাগ করছেন।
দলীয় এই রাজনৈতিক সংকটের আবহে সই জাল মামলায় আদালতকে রাজ্য সরকার আগামী সপ্তাহে কী রিপোর্ট দেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

