নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে এক ঐতিহাসিক চুক্তির মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু করল কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত’। সোমবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অধীনস্থ ন্যাশনাল হেলথ অথরিটি (NHA)-র সঙ্গে এই সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক বা মউ (MoU) স্বাক্ষর করেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর।
উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা। চুক্তি স্বাক্ষরের পর মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “সোমবার থেকেই বাংলায় মিলবে আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা। রাজ্য ও দেশের ৩৬ হাজার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত।”
মিলবে ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর সুবিধা, প্রথম কিস্তিতেই বড় বরাদ্দ
দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে চুক্তি স্বাক্ষরের পর আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লির পূর্বতন সরকার এই প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিল, সেখানে আজ টাটা-বাইবাই। উন্নয়ন বিরোধী সরকারকে বিদায় দিয়েছে রাজ্যবাসী। এবার ডবল ইঞ্জিনের সুবিধা পাবেন রাজ্যের মানুষ।”
মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই প্রকল্পের প্রথম কিস্তির ৫৭০ কোটি টাকা রাজ্যকে হস্তান্তর করেছে। বাংলায় এই স্বাস্থ্য প্রকল্পের সার্বিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে প্রাথমিক খাতে মোট ৯৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া, ‘ন্যাশনাল হেলথ মিশন’ (NHM) খাতে এই অর্থবর্ষে ভারত সরকার রাজ্যের জন্য মোট ২,১০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যার এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ৫০০ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকার হাতে পেয়েছে।
আয়ুষ্মান ভারত: প্রকল্পের মূল সুবিধাসমূহ
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, বাংলায় এই প্রকল্পের অধীনে ১ কোটি ৪৬ লক্ষ পরিবার অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ সরাসরি সুফল পাবেন। প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- বার্ষিক ৫ লক্ষ টাকার বিমা: এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিটি পরিবার প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস (নগদবিহীন) চিকিৎসার সুবিধা পাবেন।
- প্রথম দিন থেকেই কভারেজ: কোনো রকম ‘ওয়েটিং পিরিয়ড’ ছাড়াই, প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রথম দিন থেকেই উপভোক্তারা সমস্ত পুরনো বা জটিল রোগের চিকিৎসার খরচ পাবেন।
- পরিযায়ী শ্রমিকদের সুবিধা: বাংলার যে সমস্ত মানুষ কাজের সূত্রে ভিন রাজ্যে থাকেন, সেই পরিযায়ী শ্রমিকরাও দেশের যেকোনো প্রান্তে এই বিমার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিখরচায় চিকিৎসা করাতে পারবেন।
- বিশাল হাসপাতাল নেটওয়ার্ক: ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচীর আওতায় দেশজুড়ে বর্তমানে ৩৬,১৯৩টি হাসপাতাল রয়েছে, যার মধ্যে ১৬,৫৫৭টি নামী বেসরকারি হাসপাতাল।
যোগ্যতা যাচাইয়ের পদ্ধতি এখন সম্পূর্ণ অনলাইন
পূর্বে এই কার্ডের তালিকায় নাম রয়েছে কিনা তা জানতে উপভোক্তাদের বিডিও অফিস, পঞ্চায়েত বা পুরসভাতে ছুটতে হত। তবে বর্তমান প্রশাসন এই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অনলাইন এবং অত্যন্ত সহজ করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ ল্যাপটপ বা মোবাইল ব্যবহার করে মাত্র কয়েক মিনিটেই নিজেদের যোগ্যতা যাচাই করতে পারবেন।
ডিজিটাল রেশন কার্ড, পরিবারের কোনো সদস্যের নাম অথবা আধার কার্ড ব্যবহার করে কীভাবে এই তালিকায় নিজের নাম খুঁজবেন, তার নির্দেশিকা নিচে দেওয়া হলো:
1.অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ:ধাপ ১.
প্রথমে আয়ুষ্মান ভারতের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট https://pmjay.gov.in-এ যেতে হবে।
2.‘আমি কি যোগ্য’ অপশন নির্বাচন:ধাপ ২.
হোম স্ক্রিনের উপরের ডানদিকে থাকা ‘Am I Eligible’ বা ‘আমি কি যোগ্য’ অপশনে ক্লিক করতে হবে।
3.ওটিপি ভেরিফিকেশন:ধাপ ৩.
সেখানে নিজের সচল মোবাইল নম্বর দিতে হবে এবং ফোনে প্রাপ্ত ওটিপি (OTP) ও স্ক্রিনের ক্যাপচা কোডটি দিয়ে লগইন করতে হবে।
4.তথ্য পূরণ ও অনুসন্ধান:ধাপ ৪.
এরপর স্ক্রিনে প্রকল্পের নাম, নিজের রাজ্যের নাম, উপ-প্রকল্পের নাম এবং জেলার নাম নির্বাচন করতে হবে। সবশেষে নিজের নির্দিষ্ট পরিচিতি নম্বর (যেমন ডিজিটাল রেশন কার্ড, পারিবারিক নাম বা আধার নম্বর) দিয়ে সার্চ করে সিস্টেমটি ভেরিফাই করতে হবে।
এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠবে সংশ্লিষ্ট পরিবারের নাম এই স্কিমের তালিকায় আছে কি না। নাম থাকলে সেখান থেকেই সরাসরি আয়ুষ্মান কার্ডের জন্য আবেদন করা যাবে।
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, কারা কারা আলাদা আলাদা কার্ড পাবেন তা ইতিমধ্যেই স্থির হয়ে গেছে। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম ফিল-আপের মতোই এই বৃহৎ স্বাস্থ্য প্রকল্পের কাজও এবার রাজ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হতে চলেছে।

