পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের রেশ কাটতে না কাটতেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্ব বাড়ছে কলকাতার। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ফের কোনো মার্কিন বিদেশসচিবের পা পড়তে চলেছে তিলোত্তমায়। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ভারত সফরে আসছেন আমেরিকার বিদেশসচিব মার্কো রুবিও। দিল্লি-কেন্দ্রিক ঠাসা কর্মসূচির মাঝেই তিনি কলকাতা সফর করবেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও দূতাবাস সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
১৪ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফর এক বিস্ময়কর সমাপতন। ঠিক ১৪ বছর আগে, ২০১২ সালের নভেম্বরে তৎকালীন মার্কিন বিদেশসচিব হিলারি ক্লিন্টন কলকাতায় এসেছিলেন। সে সময় তিনি মহাকরণে গিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বারাক ওবামা থেকে জো বাইডেন— একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষকর্তা ভারত সফরে এলেও পশ্চিমবঙ্গ ব্রাত্যই থেকেছে। মে মাসের শেষে রুবিওর এই সফর সেই দীর্ঘ খরা কাটাতে চলেছে।
সফরের নির্ঘণ্ট ও তাৎপর্য
মার্কিন বিদেশ দফতর এখনও বিস্তারিত সূচি প্রকাশ না করলেও জানা গেছে, আগামী ২৪, ২৫ ও ২৬ মে রুবিও ভারতে থাকছেন। তাঁর এই সফরের মূল আকর্ষণ:
- কোয়াড বৈঠক: দিল্লি ওলটপালট করা ইরান যুদ্ধের আবহে ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বিদেশমন্ত্রীদের নিয়ে আয়োজিত ‘কোয়াড’ সম্মেলন।
- কলকাতা সফর: দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ফাঁকেই তিনি কলকাতায় আসবেন। কলকাতার মার্কিন কনসুলেট জেনারেল ইতিপূর্বেই জানিয়েছে যে, তারা বিদেশসচিবকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও জাতীয় প্রেক্ষাপট
কূটনীতিকদের একাংশ মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার শপথ নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় এই সফরের খবরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গত ১৪ বছরে মোদী জমানায় বিশ্বের তাবড় রাষ্ট্রপ্রধানরা ভারত সফরে এলেও কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু ছিল দিল্লি, আমেদাবাদ বা মুম্বই। পশ্চিমবঙ্গ এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মূল স্রোত থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। রুবিওর আগমন সেই দীর্ঘ ‘বনবাস’ বা বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অতীতের ছায়া ও উত্তরণ
কলকাতার ইতিহাসে বিদেশি অতিথিদের নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ১৯৬৮ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের তৎকালীন প্রধান রবার্ট ম্যাকনামারাকে বামপন্থীদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়ে হেলিকপ্টারে শহর ছাড়তে হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকে উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রনেতারা দীর্ঘকাল কলকাতাকে এড়িয়ে চলতেন। মাঝে ১৯৯৭ সালে মাদার টেরেসার শেষকৃত্যে যোগ দিতে হিলারি ক্লিন্টন বা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রানিকুল কলকাতায় এলেও, তা রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সফর ছিল না।
চলতি মাসের শেষে মার্কো রুবিও কলকাতায় পা রাখলে তা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তিত গুরুত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

