আইনজীবী বেশে কলকাতা হাইকোর্টে মমতা, সওয়াল চলাকালীন বিক্ষোভ ও ‘চোর’ স্লোগান: উত্তপ্ত আদালত চত্বর

আইনজীবী বেশে কলকাতা হাইকোর্টে মমতা, সওয়াল চলাকালীন বিক্ষোভ ও ‘চোর’ স্লোগান: উত্তপ্ত আদালত চত্বর

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক নজিরবিহীন পদক্ষেপে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে সওয়াল করলেন। ভোট-পরবর্তী হিংসা মামলায় রাজ্যবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আর্জি নিয়ে তিনি প্রধান বিচারপতির এজলাসে উপস্থিত হন। তবে শুনানি শেষে আদালত চত্বর ছাড়ার সময় একদল আইনজীবীর বিক্ষোভ এবং ‘চোর-চোর’ স্লোগানের মুখে পড়েন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।

আদালতের সওয়াল: ‘রাজ্যবাসীকে বাঁচান’

বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা নাগাদ কালো কোট ও আইনজীবীর পোশাকে হাইকোর্টে পৌঁছান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চে তিনি জানান, ১৯৮৫ সালে তিনি বার কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করেছিলেন এবং নিয়মিত সদস্যপদ নবায়ন করেছেন। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলায় সওয়াল করতে গিয়ে মমতা অভিযোগ করেন:

  • গত ৪ মে ফলপ্রকাশের পর রাজ্যে প্রায় ২,০০০ হিংসার ঘটনা ঘটেছে।
  • তৃণমূলের ১৬০টি দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
  • নারী, শিশু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হচ্ছে; নারীদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
  • পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং অনলাইনে অভিযোগ জানাতে হচ্ছে।

আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গ কোনো বুলডোজার রাজ্য নয়। দয়া করে রাজ্যবাসীকে বাঁচান।” তৃণমূলের পক্ষে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যও সওয়ালে অংশ নেন।

হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ

মমতার সওয়ালের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানায়:

  1. রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে বাড়ি বা দোকান থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না।
  2. কাউকে ঘরছাড়া করা হলে তাঁকে অবিলম্বে নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে।
  3. আগামী পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত পক্ষকে হলফনামা জমা দিতে হবে।

আদালত আরও জানিয়েছে, হলফনামা পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে যে মামলাটি পাঁচ বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না।

আদালত চত্বরে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা

শুনানি শেষ করে বেরোনোর সময় লবিতে একদল আইনজীবী মমতাকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ শুরু করেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়। ভিড়ের চাপে মমতা অভিযোগ করেন, তাঁকে মারধর করা হয়েছে। পুলিশের ঘেরাটোপে কোনোক্রমে তিনি এলাকা ছাড়েন।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে তৃণমূল। মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, “বিজেপি রাজ্যে কোন ধরনের গণতন্ত্র চাইছে তা স্পষ্ট।” অন্যদিকে, বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এটি তৃণমূলের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। বিজেপি এই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে না।”

বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার তৎপরতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়ালের পরই সক্রিয় হয়েছে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (BCI)। তারা রাজ্য বার কাউন্সিলের কাছে মমতার ‘লিগ্যাল প্র্যাকটিস স্টেটাস’ জানতে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। আগামী দুই দিনের মধ্যে তাঁর সদস্যপদ ও প্র্যাকটিস সংক্রান্ত সমস্ত নথি তলব করা হয়েছে।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও দলের হাল

ভোটের বিপর্যয়ের পর গত ১০ দিন কালীঘাটের বাড়িতেই ছিলেন মমতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি আদালতে গিয়ে সওয়াল করার মাধ্যমে তিনি বিপর্যস্ত দলীয় কর্মীদের মনোবল বাড়ানোর কৌশল নিয়েছেন। তবে দলের একাংশের মতে, নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে যে ভীতি ও হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কেবল আইনি লড়াইয়ে কতটা কাটবে সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

রাজ্যের আইনজীবী ধীরজ ত্রিবেদী অবশ্য আদালতে পাল্টা দাবি করেছেন যে, হিংসার অভিযোগগুলির কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা বাস্তব ভিত্তি নেই এবং পুলিশ সম্পূর্ণ সতর্ক রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.