বাংলাদেশে হামের মহামারিতে ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু; ধসে পড়া স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় উদ্বেগ

বাংলাদেশে হামের মহামারিতে ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু; ধসে পড়া স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় উদ্বেগ

বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব। গত ১৯ দিনে দেশজুড়ে অন্তত ৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এই সংক্রামক রোগে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভেঙে পড়া টিকাদান কর্মসূচির জেরে এই মারণরোগের দাপটে আক্রান্তের সংখ্যা ৫,৭০০ ছাড়িয়ে যাওয়ায় গোটা দেশে এক জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।


সংক্রমণের পরিসংখ্যান ও ভয়াবহতা

স্বাস্থ্য দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই ১৯ দিনে সংক্রমণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী।

  • সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টা: রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
  • আক্রান্তের সংখ্যা: বর্তমানে ৫,৭৯২ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন। শনিবার থেকে রবিবারের মধ্যেই ৯৭৪ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
  • ভৌগোলিক বিস্তার: বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টি জেলাতেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে উত্তর-পশ্চিমের রাজশাহীতে সংক্রমণের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।

ভ্যাকসিনের অভাব ও রাজনৈতিক চাপানউতর

এই বিপুল সংখ্যক শিশুর অকাল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এই সংকটের জন্য মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়ী করেছে।

সরকারের অভিযোগ: ১. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক সরবরাহ করা হয়নি। ২. স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের জুন মাসে একটি পরিকল্পিত হাম নিরোধক টিকাদান কর্মসূচি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পিছিয়ে যায়। সেই গাফিলতির মাশুল এখন দিতে হচ্ছে। ৩. ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হামজনিত মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও দুর্বল টিকাদান কর্মসূচির কারণে তা ব্যর্থ হয়েছে।


চিকিৎসকদের উদ্বেগ ও পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি মৃত্যুর পরিসংখ্যান (৯৪ জন) প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম হতে পারে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিশু রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ৫,৭৯২ জন সম্ভাব্য আক্রান্তের মধ্যে মাত্র ৭৭ জনের ল্যাব পরীক্ষায় ‘হাম’ নিশ্চিত করা গেছে। এটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাকেই প্রকট করে তুলেছে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সতর্কতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ যা মূলত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী। এর ফলে মস্তিষ্কে প্রদাহ (Brain Swelling), তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। বাংলাদেশে ২০০৫ সালের পর ২০২৬-এর এই প্রাদুর্ভাব বিগত সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.