ভাঙল অ্যাপোলো ১৩-র অর্ধশতাব্দীর রেকর্ড: মহাকাশে নয়া ইতিহাস গড়ল নাসার ‘আর্টেমিস ২’

ভাঙল অ্যাপোলো ১৩-র অর্ধশতাব্দীর রেকর্ড: মহাকাশে নয়া ইতিহাস গড়ল নাসার ‘আর্টেমিস ২’

মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল নাসা (NASA)। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর ভাঙল মানুষের তৈরি করা মহাকাশে সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রমের রেকর্ড। ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩-র তিন নভোচারী পৃথিবী থেকে যে দূরত্বে পৌঁছেছিলেন, সোমবার সেই রেকর্ড টপকে আরও গভীরে পৌঁছে গেলেন আর্টেমিস ২ (Artemis II) মিশনের চার মহাকাশচারী।

রেকর্ডের নতুন পরিসংখ্যান

১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে এক ভয়াবহ অক্সিজেন ট্যাংক বিস্ফোরণের পর জীবন বাঁচাতে অ্যাপোলো ১৩-র নভোচারীরা পৃথিবী থেকে ৪ লক্ষ ১৭১ কিলোমিটার দূরে চলে গিয়েছিলেন। গত পাঁচ দশক ধরে সেটিই ছিল মানুষের পৌঁছানো সর্বোচ্চ দূরত্বের রেকর্ড। সোমবার নাসার ওরিয়ন (Orion) ক্যাপসুলে থাকা চার নভোচারী— কমান্ডার রেড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কক এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন— চাঁদকে পাশ কাটিয়ে পৃথিবী থেকে ৪ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭৩ কিলোমিটার দূরে পৌঁছে যান। অর্থাৎ, পুরনো রেকর্ড ভাঙল প্রায় ৬ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের ব্যবধানে।

ছয় ঘণ্টার সেই ঐতিহাসিক ‘ইউ-টার্ন’

গত ১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করেছিল আর্টেমিস ২। অভিযানের পঞ্চম দিনে ওরিয়ন ক্যাপসুলটি চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার দূর দিয়ে চক্কর কেটে পৃথিবীর দিকে ফেরার পথ ধরে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’। পৃথিবী ও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি বাঁচিয়ে ফিরে আসার এই কৌশলটি অনেকটা ইংরেজি সংখ্যা ‘৮’-এর মতো পথ তৈরি করে। মহাকাশ বিজ্ঞানে একে ‘কসমিক এইট’ বা মহাজাগতিক আট-ও বলা হয়, যা সৌরজগতের আটটি গ্রহের (বুধ থেকে নেপচুন) শৃঙ্খলকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।

এক মিশনে একাধিক ইতিহাস

আর্টেমিস ২ মিশন কেবল দূরত্বের রেকর্ড ভাঙেনি, বরং সামাজিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে:

  • ভিক্টর গ্লোভার: প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে চাঁদের এত কাছে পৌঁছালেন।
  • ক্রিস্টিনা কক: চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছানো প্রথম নারী মহাকাশচারী।
  • জেরেমি হ্যানসেন: প্রথম অ-মার্কিন (কানাডিয়ান) নাগরিক হিসেবে এই গৌরবের অংশীদার হলেন।

চাঁদের অন্ধকার দিক (Far side) অতিক্রম করার সময় প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবীর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল নভোচারীদের। সেই নীরব মুহূর্তেই তাঁরা চাঁদের এমন রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন যা এর আগে কোনো মানুষের চোখ এত কাছ থেকে দেখেনি।

পরবর্তী লক্ষ্য: চাঁদে বসতি স্থাপন

আগামী শুক্রবার প্রশান্ত মহাসাগরে ওরিয়ন ক্যাপসুলের অবতরণের (Splashdown) কথা রয়েছে। তবে নাসা এখানেই থামছে না। এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে পরবর্তী নীল-নকশা:

  • ২০২৭ (আর্টেমিস ৩): চাঁদের কক্ষপথে ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং মহড়া।
  • ২০২৮ (আর্টেমিস ৪): চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় পর আবার মানুষের পদচিহ্ন পড়বে।

নাসার এই অভিযান প্রমাণ করল, মানুষ এবার কেবল চাঁদে যাওয়ার জন্য নয়, বরং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস ও গবেষণার স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.