দাড়িভিটের ভাষা আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি বাচাঁনোর আকুতি

দাড়িভিটের ভাষা আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি বাচাঁনোর আকুতি

১৯৭১ সালের ভয়াবহতা যেন আবার ফিরে এসেছিল ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বরে। বুঝেছিল রাজেশ আর তাপস। তারা বলিদান দিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসীর চোখ খোলার চেষ্টা করেছিল। রাজেশ – তাপসের দাবি ছিল তাদের বিদ্যালয়ে একজন বাংলা ভাষার শিক্ষকের। কিন্তু উত্তর দিনাজপুরের দাড়িভিট হাই স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল উর্দু শিক্ষককে। রাজেশ – তাপসের পাশে আসে এলাকার মানুষজন। ২০১৮ সালের উত্তর দিনাজপুরে ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের সময় কুমিল্লার কাছে ময়নামতী সেনানিবাসে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়েছিল ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু কে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী রমণী শীল, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কে হত্যার প্রতিটি পদক্ষেপ দেখেছেন। আর ২০১৮ সালে পুলিশের গুলিতে নিহত রাজেশ সরকার ও তাপস বর্মণের বলিদান দেখেছে দাড়িভিটের মানুষ।ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান হলেও ভাষার মাধ্যমে হিন্দুদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বন্ধনের একটা পথ খোলা ছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পরাস্ত হয় আর পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিশেষত হিন্দুদের উপর নেমে আসে পাশবিক অত্যাচার। হিন্দুদের সম্পত্তি লুটপাট করা হয় , মেয়েদের উপর নৃশংসতার বর্ণনাও চোখে জল আনে। ১৯৭০ সালের ২৫-২৬ শে মার্চ সেনা নামিয়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী , অধ্যাপকদের হত্যা করা হয় যাদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা ছিল বেশি। ভাষার উর্দুকরণ করলে যে জিহাদী কট্টরতাকে জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তার প্রমাণ বর্তমান বাংলাদেশের ইউনূস সরকারের নৃশংসতা।প্রায় প্রতিদিন হিন্দু হত্যা, হিন্দু নারীদের সম্মান লুঠের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ইসলামিক বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত স্থান কে জিহাদীরা ধ্বংস করছে। প্রতি বছর বইমেলায় বাংলাদেশের স্টলগুলোতে রবীন্দ্রনাথ – শরৎচন্দ্র – বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার প্রায় দুষ্প্রাপ্যতা বলে দেয় সেই ১৯৭১ এর উর্দুকরণের পরিকল্পনা কি ছিল। ধীরে ধীরে ভাষা-সাহিত্যে উর্দু ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে যে বাংলার সংস্কৃতিকে পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে সে বিষয়ে বিশ্বকবি সচেতন ছিলেন আর তাঁর দুটি প্রবন্ধ ‘ভাষা শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘মক্তব-মাদ্রাসার বাংলা ভাষা’য় সেই চিন্তার বিশ্লেষণ দেখতে পায়। কবিগুরু বলেছিলেন —
“আমাদের ঝগড়া আজ যদি ভাষার মধ্যে প্রবেশ করে সাহিত্যে উচ্ছৃঙ্খলতার কারণ হয়ে ওঠে তবে এর অভিসম্পাত আমাদের সভ্যতার মূলে আঘাত করবে।
….আজকাল সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে আশ্রয় করে ভাষা ও সাহিত্যকে বিকৃত করবার যে চেষ্টা চলছে তার মতো বর্বরতা আর হতে পারে না”।
আর এই বর্বরতা ভাষা শিক্ষাকে কেন্দ্র করে ১৯৭১ সালে সভ্যতাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিল আর ২০২৬ সালের বাংলাদেশে তার পরিণতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশ আজ হিন্দু শূন্য হওয়ার পথে।
২০১৮ সালের রক্তাক্ত দাড়িভিট শুধু বাংলা ভাষা রক্ষার আকুতি জানায় নি, জানিয়েছিল সভ্যতা বাঁচানোর সাবধান বাণী। সভ্যতা বাঁচানোর স্বার্থেই যে পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল হিন্দুদের নিরাপদ বাসভূমি দেওয়ার জন্য, সেই পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যপুস্তকে ‘রামধনু’ কে ‘রংধনু’ বলা আর বিভিন্ন সরকারি হোর্ডিং-এ উর্দু ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি রাজেশ-তাপসের লড়াইয়ের যথার্থতা প্রমাণ করে।
তাদের মৃত্যুর তদন্ত এখন NIA-এর হাতে। কিন্তু রাজেশ-তাপস আমাদের যেন প্রশ্ন করছে , ভাষা কে বাঁচানোর মাধ্যমে সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব এখন কাদের হাতে?

পিন্টু সান্যাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.