নোবেল পুরস্কার পাননি, তাই শান্তি নিয়ে চিন্তিত নন! গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবির কারণ ব্যাখ্যা করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

গত কয়েক দিনে তিনি বার বার গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি করেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘যে কোনও মূল্যে’ গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করা হবেই। হয় চুক্তির মাধ্যমে নয়তো বলপ্রয়োগ করে! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন গ্রিনল্যান্ড চাইছেন, তার ব্যাখ্যা দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, চিন এবং রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করতে গ্রিনল্যান্ড দখল নেওয়া প্রয়োজন। তবে আদৌ কি ট্রাম্পের এটাই উদ্দেশ্য! প্রশ্ন ছিল। জল্পনা ছিল। এ বার খোদ ট্রাম্পই আসল কারণ ব্যাখ্যা করলেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়ুনাস গর স্টুরকে পাঠানো এক চিঠিতে।

কী লিখেছেন ট্রাম্প? নোবেল পুরস্কার না-পাওয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির সম্পর্ক রয়েছে! চিঠিতে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘‘আটটি যুদ্ধ থামানোর পরেও আপনার দেশ (নরওয়ে) আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়নি। তাই আমি এখন শান্তির কথা ভাবা বাধ্যবাধকতা বলে মনে করি না। আমি এখন দেখি আমেরিকার জন্য কী ভাল, আর কী খারাপ।’’ ট্রাম্প বুঝিয়ে দিয়েছেন, সেই কারণে আমেরিকার কথা ভেবেই শান্তির পথ থেকে সরে এসে গ্রিনল্যান্ড দখলের দাবি অব্যাহত রেখেছেন তিনি।

২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন ভেনেজ়ুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। বিজয়ীর নাম ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ট্রাম্প দাবি করছিলেন, এই পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য। কারণ হিসাবে দেখিয়েছিলেন, গত কয়েক মাসে বিশ্বের আটটি যুদ্ধ তিনি থামিয়েছেন। সেই কৃতিত্বের জন্যই নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য, দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত নরওয়ের নোবেল কমিটি তাঁকে পুরস্কার দেয়নি। জয়ী হিসাবে মাচাদোর নাম ঘোষণা করা হয়। এর পরেই অবশ্য মাচাদো ওই পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছিলেন। গত ৩ জানুয়ারি আমেরিকার বাহিনী ভেনেজ়ুয়েলায় হামলা চালায় এবং সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যায়। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মাচাদো হোয়াইট হাউসে যান এবং নিজের পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন। যদিও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, নোবেল পুরস্কার কে পাবেন, তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর সরকারের কোনও ভূমিকা নেই। পুরোটাই ঠিক করেন নোবেল কমিটি।

অন্য দিকে, আমেরিকার গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের দাবি সমর্থন না-করায় ইউরোপের আটটি দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ব্রিটেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, ফিনল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডস্‌। এই সমস্ত দেশ থেকে যে সব পণ্য আমেরিকায় রফতানি করা হয়, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তার উপর ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক কার্যকর হবে। প্রয়োজনে আগামী দিনে শুল্কের পরিমাণ বেড়ে হতে পারে ২৫ শতাংশ। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সমঝোতা না-হওয়া পর্যন্ত শুল্ক বহাল থাকবে বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সমালোচনার ঝড় উঠেছে ইউরোপে। আমেরিকার বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ করতে উদ্যোগী ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর সদস্য দেশগুলি। রবিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেল্‌সে একটি জরুরি বৈঠকে মিলিত হয়ে ওই দেশগুলির প্রতিনিধিরা ‘ট্রেড বাজ়ুকা’ বা ‘শুল্ক-ব্রহ্মাস্ত্র’ প্রয়োগের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। ‘ট্রেড বাজ়ুকা’ হল ইউরোপীয় ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে থাকা একটি বন্দোবস্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, এই রকম এক বা একাধিক দেশ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এই অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারে ইইউ-র সদস্য দেশগুলি।

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া বা চিনের থেকে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করার ক্ষমতা নেই ডেনমার্কের। তারা যে মালিকানা ভোগ করছে, তার কোনও লিখিত নথি নেই। চিঠিতে নেটো নিয়ে কথা বলেছেন ট্রাম্প। তাঁর কথায়, ‘‘নেটোর জন্য অন্য কারও তুলনায় আমি বেশি কাজ করেছি। এখন নেটোর উচিত আমেরিকার জন্য কিছু করা।’’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, ‘‘গ্রিনল্যান্ডের উপর আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না-থাকলে বিশ্ব নিরাপদ নয়।’’

উল্লেখ্য, ডেনমার্কের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ৫৬ হাজার জনসংখ্যার ‘বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ’ প্রায় ৩০০ বছর ধরে কোপেনহাগেন (ডেনমার্কের রাজধানী)-এর নিয়ন্ত্রণে। অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি পরিচালনা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত দায়িত্ব দ্বীপটির স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষ পালন করেন। আর বিদেশ এবং প্রতিরক্ষানীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলি নেয় ডেনমার্ক সরকার। গ্রিনল্যান্ডও চায় আমেরিকা নয়, ওই ভূখণ্ডের উপর ডেনমার্কেরই ‘দখল’ থাকুক। তবে এটা পছন্দ নয় ট্রাম্পের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.