‘শিল্পের বধ্যভূমি’ নয়, ‘পবিত্রভূমি’ সিঙ্গুর প্রণাম পেল মোদীর! টাটা ফেরানোর বার্তা না-শুনেই ফিরল জনতা, অস্বস্তিতে রাজ্য নেতৃত্ব

বিকেল ৪টে ১৯ মিনিটে তিনি শেষ করলেন ৩৬ মিনিটের ভাষণ। তার পরে বড়জোর মিনিট ১০-১২। ‘টাটার মাঠ’ থেকে কলকাতা বিমানবন্দরের পথে উড়ে গেল তাঁর হেলিকপ্টার বহর। সাধারণত জনসভা সেরে মঞ্চের পিছনের অস্থায়ী লাউঞ্জে বা তাঁবুতে রাজ্য নেতাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু রবিবার সিঙ্গুরের ময়দানে রাজ্য নেতাদের সঙ্গেও তেমন উল্লেখযোগ্য কথোপকথন তাঁর হয়নি বলে বিজেপি সূত্রের খবর। ঠিক যে ভাবে সিঙ্গুরও রবিবার প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছ থেকে ‘কাঙ্খিত’ বার্তা পায়নি। অন্তত স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই তা মনে করছেন।

সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ ফেরানোর প্রসঙ্গ মোদী ছুঁলেন বটে। তবে শুধু ছুঁলেনই। সিঙ্গুরকে শুনিয়ে গেলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ ফেরানোর ‘পূর্বশর্ত’ হল আইনশৃঙ্খলার উন্নতি। আর তা সম্ভব শুধু তৃণমূল হারলে।

হুগলির সিঙ্গুরে মোদী জনসভা করবেন বলে যে দিন জানা গিয়েছিল, সে দিন থেকেই আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল মোদীর কাছ থেকে সম্ভাব্য ‘শিল্পবার্তা’ পাওয়া নিয়ে। সে জল্পনা শুধু সাধারণ জনতার মধ্যে বা সিঙ্গুরবাসীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির নেতারাও বার বার নানা মন্তব্যে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর জনসভা থেকেই শিল্প পুনরুজ্জীবনের আশ্বাস পাবে সিঙ্গুর তথা পশ্চিমবাংলা। প্রধানমন্ত্রীর সভা আয়োজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় হন বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য হন বা প্রথম সারিতে থাকা অন্য কোনও মুখ। সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রীর জনসভার প্রস্তুতি পর্বে যত বার বিজেপি নেতারা মুখ খুলছিলেন, তত বারই আভাস দিচ্ছিলেন, সিঙ্গুরে মোদীর সভা থেকেই রাজ্যের শিল্পায়ন সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট বার্তা পাওয়া যাবে।

রবিবার এমনকি, প্রধানমন্ত্রীর সভামঞ্চ থেকেও রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্বের মুখে সে সব কথা ফের শোনা গিয়েছিল। সভামঞ্চে মোদী পৌঁছোনোর আগে এলাকার প্রাক্তন সাংসদ তথা রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ভাষণ দেন। সেই বক্তৃতা বলছিল, প্রধানমন্ত্রী যে সিঙ্গুরে শিল্প ফেরানোর বার্তা দিয়ে যাবেন, সে বিষয়ে তাঁরা প্রায় নিশ্চিত। প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে পৌঁছোনোর পরে দু’জন ভাষণ দেন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য সভাপতি শমীক। রাজ্য সভাপতি সিঙ্গুরকে ‘শিল্পের বধ্যভূমি’ আখ্যা দিলেন। কিন্তু তাঁর পরেই ভাষণ দিতে উঠে মোদী সে সব প্রসঙ্গে ঢুকলেন না। ‘বধ্যভূমি’ হোক, সিঙ্গুর থেকে টাটার বিদায় হোক বা তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে গুজরাতের সাণন্দে টাটার পদার্পণ, কোনও প্রসঙ্গেই গেলেন না। বরং সিঙ্গুরকে ‘পবিত্রভূমি’ বলে প্রণাম জানালেন।

অস্তগামী সূর্যের সিঙ্গুর। প্রধানমন্ত্রীর জনসভা শেষে টাটার মাঠের খালপাড় ধরে খাসেরভেড়ির দিকে ফিরছেন বিজেপি সমর্থকরা।

তবে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন নিয়ে মোদী কিছুই যে বলেননি, তা নয়। বলেছেন, ‘‘এ রাজ্যে বিনিয়োগ তখনই আসবে, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক হবে। কিন্তু এখানে মাফিয়াদের ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে সব কিছুতে সিন্ডিকেট ট্যাক্স বসিয়ে রাখা হয়েছে। এই সিন্ডিকেট ট্যাক্স এবং মাফিয়াবাদকে বিজেপিই শেষ করবে। এটাই মোদীর গ্যারান্টি।”

প্রচার ছিল, সিঙ্গুরের অনেকেই এখন যে শিল্পকে ‘তাড়ানো’ নিয়ে আফশোস করেন, সেই শিল্পকেই সিঙ্গুরে ফেরানোর বার্তা দিতে প্রধানমন্ত্রী আসছেন। ফলে সভাস্থল উপচে জমায়েত পৌঁছে গিয়েছিল রাস্তায়। সিঙ্গুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় সংখ্যায় মহিলারা জড়ো হয়েছিলেন। মোদীর ভাষণ শেষ হওয়ার পরে তাঁরা কি উজ্জীবিত? সিংহেরভেড়ি মৌজায় টাটার মাঠের ভাঙা পাঁচিলের গলতা দিয়ে ধূলিধূসর পায়েচলা রাস্তা বেয়ে যখন তাঁরা যখন বাড়ির পথ ধরলেন, তখন পশ্চিম দিগন্তে ম্লান হয়ে আসা সূর্যের মতো তাঁদের উৎসাহও অস্তগামী। রাজনীতির ভাষ্য খুব স্পষ্ট যে বোঝেন, তেমন নয়। তবে সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রী আসছেন, বড় কিছু হচ্ছে, অনেক দিন পরে সিঙ্গুরে আবার আশা জাগছে— এই আবহ প্রভাবিত করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে কী বুঝলেন? প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললেন মধ্য চল্লিশের মহিলা। বললেন, ‘‘কী আর বুঝব? প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন। দেখলাম। কথা শুনলাম।’’ শুনে কী মনে হল? কৃষক গৃহবধূ আবার হেসে ফেলেন, ‘‘কী আর মনে হবে? ভালই লাগল। প্রধানমন্ত্রীকে দেখলাম। হেলিকপ্টারও দেখলাম।’’

বছর চল্লিশের বিজেপি কর্মী শ্রীমন্ত দাসের গলায় যদিও খানিক অন্য সুর। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গুরে টাটাকে ফেরানো নিয়ে কিছু বলেননি। গলায় পদ্মফুল আঁকা উত্তরীয় এবং ‘স্বেচ্ছাসেবক’ কার্ড ঝুলছে। বিজেপির সক্রিয় কর্মী শ্রীমন্ত সভাস্থলের প্রবেশপথে দলের তরফে মোতায়েন ছিলেন। বললেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী বললেন তো সিঙ্গুরে শিল্প ফেরাবেন!’’ কখন বললেন? তিনি শুনেছেন? শ্রীমন্তের জবাব, ‘‘দু’তিন জন তো বললেন বলে মনে হল।’’ সেই দু’তিনজনের মধ্যে কি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন? বললেন তো বিজেপির রাজ্য নেতারা। শ্রীমন্তের উত্তর, ‘‘আমায় আসলে গেটে ডিউটি দিয়েছিল। বলেছিল, প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে পাওয়ার আশা রেখো না। আমি সেই কাজ করছিলাম। প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন, সবটা জানি না।’’ কিন্তু সিঙ্গুরে টাটাকে ফেরানোর বা শিল্প ফেরানোর বিষয়ে নির্দিষ্ট কথা বলা যে বলা জরুরি ছিল, তা শ্রীমন্ত মানছেন। বলছেন, ‘‘অনেকেই তো আশা করে ছিল। ওই কথাগুলোই শুনতে এসেছিল তো।’’

সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসভা।

রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব প্রত্যাশিত ভাবেই মোদীর ‘ঢাল’ হয়ে ওঠার চেষ্টায়। সভার পরে শমীক বলছেন, ‘‘সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, সেটাই তো এ রাজ্যের শিল্পায়ন সম্ভাবনার বিষয়ে মোদ্দা কথা! আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক না-হলে কেউ পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করতে আসবেন না। আর আইনশৃঙ্খলা ঠিক করবে বিজেপি। এটাই আসল কথা। সিঙ্গুরই ছিল এই বার্তা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান।’’ রাজ্য বিজেপি সভাপতির মতে, ‘‘মোদীজি সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে গ্যারান্টি দিয়ে গিয়েছেন। গ্যারান্টি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করার এবং তার মাধ্যমেই বিনিয়োগ ফেরানোর।’’

শমীক যে ব্যাখ্যাই দিন, বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বও যে খানিক হতাশ, সে খবর বিজেপি সূত্রে মিলছে। সিঙ্গুরকে সভাস্থল হিসাবে বেছে নেওয়ার যে তাৎপর্য, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে তার আঁচ যে তেমন মেলেনি, তা বিজেপির অনেক প্রথম সারির নেতাও মনে করছেন। আগামী কয়েক দিনে এ সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের মোকাবিলা যে করতে হবে, সে বিষয়েও রাজ্য বিজেপির অন্দরে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।

প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠতেও শুরু করেছে। রবিবারই তৃণমূলের তরফ থেকে শশী পাঁজা বলেছেন, ‘‘সকাল থেকে যেন একটা চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী এসে সিঙ্গুরকে উদ্ধার করে দেবেন। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা অসম্পূর্ণ ছিল, না কি অস্পষ্ট ছিল, জানা নেই। আমরা দেখলাম, বিজেপি নেতৃত্ব যে প্রত্যাশার কথা বলছিলেন, সে রকম কোনও প্রত্যাশা বা আশার আলো তিনি দেখাতে পারেননি।’’ সিঙ্গুরের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনে ‘হতাশ’ হয়েছেন বলে দাবি করেছে তৃণমূল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.