আকন্দ ফুলের আলংকারিক রূপ দেখে বিমোহিত হয়ে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক শিল্পী সুধীরঞ্জন মজুমদার তা আলপনায় রূপান্তরিত করেছেন। আকন্দ ফুলের কেন্দ্রের চূড়ায় পাশাপাশি চারটি উল্টোনো কলকা। ফুলটিকে ওপর থেকে দেখলে তার পাঁচটি পাপড়ির গতির চক্রাকার ঘূর্ণন বিস্ময় জাগায়। আকন্দ ফুলের মধ্যে element of design পুরো মাত্রায়।
অর্ক বা আকন্দ ফুলে থাকে পাঁচটি সূঁচালো পাপড়ি, ফুলের মাঝখান থেকে উঠে আসে একটি ছোট মুকুটের মতো অংশ যা পুংকেশরগুলিকে ধরে রাখে। পুংকেশরগুলি ঝিল্লিযুক্ত উপাঙ্গ নিয়ে ছোট পঞ্চভুজাকার স্টিগমা বা গর্ভমুণ্ডের অবনমিত শীর্ষের উপর বাঁকানো। আকন্দ ফুলের অ্যাস্টিভেশন হল ভালভেট অর্থাৎ পাপড়ি একটি ঘূর্ণায়মান অংশে থাকে, কেবল প্রান্তে একে অপরকে করে স্পর্শ। আকন্দে গাইনোস্টেজিয়ামের উপস্থিতি, অর্থাৎ স্টিগমা এবং অ্যান্ড্রোসিয়ামের অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী অংশের সংমিশ্রণ। এটাই কী শিবশক্তির মিলন! আকন্দ ফুল এনটোমোফিলি পরাগায়নের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কারণ এই ফুল কীট দ্বারা পরাগায়ন হয়, যেমন মৌমাছির দ্বারা। ফুলের পরাগরেণুগুলি পলিনিয়া নামক একটি কাঠামোতে থাকে যা গর্ভমুণ্ডে গ্রন্থিযুক্ত, আঠালো ডিস্কের সাথে সংযুক্ত থাকে। ডিস্কগুলি ফুলে ভ্রমণরত মৌমাছির পায়ের সাথে সংযুক্ত হয় এবং পতঙ্গ সরে গেলে পলিনিয়া টেনে বের করে আনে। এই পতঙ্গ আবার অন্য ফুলে ভ্রমণ করলে সেই ফুলটি পলিনিয়াম দ্বারা পরাগায়িত হতে পারে।
আলপনায় ব্যবহৃত সমস্ত প্রতীকচিহ্নগুলি পরিবেশ-পরিস্থিতির দ্যোতক। মোটিফ প্রকাশের চিত্র, তাকেই চিহ্ন-সংকেত বা প্রতীক বলা যেতে পারে। আলপনায় কয়েকটি বিশেষ অঙ্কনরীতি যেমন পদ্ম, ধান, সাপ, প্যাঁচা সহ নানান পাখি, লতামণ্ডন, কলা, গুয়া, সুপারি, কড়ি, মাছ, ময়ূর, ভ্রমর, প্রজাপতি, হাঁস, মৌচাক নৌকো, সূর্য, চন্দ্র, তারা, গোলাঘর, গরু-বাছুর ইত্যাদি। কোনোটি ফসল, কোনোটি বাংলার চিরায়ত জৈববৈচিত্র্য। আলপনার মধ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সরলতার একককে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছে সৌন্দর্য-প্রিয় মানুষ। আলপনাই সম্ভবত সবচাইতে প্রাচীন চিত্রকলার এক বিবর্তিত রূপ, যেখানে অঙ্কনের মূল কাঠামোটি আবিষ্কারের চেষ্টা আছে। আলপনার তন্বিষ্ঠ পাঠ করলে দেখা যাবে সেখানে পরিবেশিত চিহ্ন-সংকেতে পরিবেশ-ভাবনা। সূর্য-চন্দ্র-তারা-নদী-সমুদ্র-পর্বত-বনানী এবং জৈববৈচিত্র্যের সমাহারে যে সামগ্রিক চিত্র উপস্থাপিত হয়। এ সকলই লোকশিল্পীর চেনা-পরিচিত জগতের চিত্ররূপ। মানুষ যা দেখে তাই ভাবে, তাই আঁকা হয়ে ধরা দেয়। আকন্দের আলপনা এঁকে লোকমানস ধরা দিলে শিল্পী সুধীররঞ্জনও। একটি প্রচল কথা হল, “আকন্দে যদি মধু পাই, তবে কেন পর্বতে যাই!” মধুকর এই কথা বলছে সহকর্মী মধুকরকে। বাঘা মৌমাছি বা Rock Bee-এর আত্মকথা। মৌমাছি রোজই এই আলপনা অবলোকন করে আকন্দ পুষ্পে। বুনোফুলের এ এক অরূপ সৌন্দর্য, তা যেন শিবরাত্রির দিনে আমরা ভুলে না যাই। সামান্য আয়োজনে ভগবান শিব সন্তুষ্ট, এটাই সবচেয়ে বড় অসামান্যতা।
ড. কল্যাণ চক্রবর্তী
