ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ

ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তীর ৭৫-তম বর্ষ পূর্ণ হতে চলেছে।দেখতে দেখতে কবেই যেন স্বাধীনতা বৃদ্ধ হয়ে গেল !

 এক শত নব্বই বছর ধরে চলা ব্রিটিশের অপশাসন-শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে জীবন পণ করে ভারতবাসী লড়েছিল।এই লড়াই-সংগ্রাম কোনো ব্যক্তি,সংগঠন একক ভাবে যে করেছেন--তা নয়।বিশাল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ব্যক্তির নেতৃত্বে,বিভিন্ন সংগঠনের স্বাধীনতাকামীগণ, নানা সময়ে,নানা ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রাম করে গিয়েছেন।সেই সব হাজার হাজার মুক্তি-সৈন্যের নাম ঠিকানা আমরা কিছুই জানি না।অথচ তাঁদের প্রাণের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা আমরা ভোগ করছি!কখনো-বা স্বাধীনতার অপব্যবহার করছি!
ভারতীয় স্বাধীনতার "অমৃত মহোৎসব"-এর প্রাক্কালে,ভারতীয় বীরদের পাশাপাশি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি পৃথিবীর সব দেশের সকল নামজানা ও অজ্ঞাত নামধারী স্বাধীনতা যোদ্ধাদের!তাঁদের উদ্দেশ্যে যথাযথ শ্রদ্ধা না-জানালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি বিনত শ্রদ্ধা যেন অপূর্ণ থেকে যায়!
স্বাধীনতা প্রাপ্তীর বহু আগে থেকেই,তৎকালীন অনেক সুবিধাবাদী রাজনীতিকগণ নানা ভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে গিয়েছেন।তাঁদের সেই হীন চক্রান্তে অনেক অনেক স্বার্থশূন্য প্রকৃত দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামী-বিপ্লবীরা স্বাধীনতার পরও প্রকৃত সম্মান পান নি!যাঁরা কংগ্রেসের চাটুকারিতা করেছেন,তাঁরাই স্বাধীনতার পর নানা ভাবে উপকার পেয়েছেন।পদ-অর্থ-যশ--সবই পেয়েছেন! যাঁরা গান্ধী-নেহেরুর চাটুকারিতা করেন নি,যাঁরা কোনো কিছুর বিনিময়েই ভারতের সাথে,দেশবাসীর সাথে বেইমানি করেন নি,তাঁরা যোগ্য সম্মান তো পানই নি!এমন-কি স্বাধীনতার পর তাঁরা স্বাধীন ভারতের পবিত্র মাটিও স্পর্শ করতে পারেন নি!যেমন,রাসবিহারী বসু ও নেতাজী।যদিও নেতাজীকে নিয়ে বিতর্ক আছে।তিনি স্বাধীন ভারতে এসেছিলেন কি না তা নিয়ে।
স্বাধীনতার পর কংগ্রেসী ঘরানার পণ্ডিতদের দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লেখা শুরু হল।স্বাভাবিক ভাবেই যাঁরা কংগ্রেসের তাঁবেদার ছিলেন না,তাঁদেরকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হল।যাঁদের নিতান্তই মুছতে পারা গেল না,তাঁদের জন্য গুটিকয়েক কথাই উল্লেখিত হল মাত্র।

    এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আর.এস.এস.-এর কথা।এ সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৫ সালের বিজয়া তিথিতে।প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার।তিনি ডাক্তারজী নামেই সমধিক পরিচিত।কেন না,তিনি কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকেই এম.বি.বি.এস পাশ করেছিলেন।এখানে পড়তে এসেই তিনি তখনকার বিভিন্ন বিপ্লবী দল যথা অনুশীলন সমিতি,বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স প্রভৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন।পড়া শেষ করে তিনি নিজ রাজ্য মহারাষ্ট্রে ফিরে যান।কয়েকটি কংগ্রেসী আন্দোলনেও যোগ দেন।তাদের সাথে মিশেই ডাক্তারজী কংগ্রেসী নেতাদের স্বরূপ অত্যল্পকালের মধ্যেই বুঝে নিয়েছিলেন।তখন থেকেই তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন স্বাধীন ভারতের ভবিষ্যৎ ভেবে! কী ভাবে রক্ষিত হবে স্বাধীনতা,কী ভাবে সুরক্ষিত থাকবে ভারত মাতা!ব্যাকুল পিপাসা নিয়ে তিনি ছুটে গেলেন পন্ডিচেরীতে।ঋষি অরবিন্দের আশ্রমে।তাঁর সাথে দেখা করতে।কিন্তু তখন তিনি কারুর সাথে না-করেন দেখা,না-বলেন কথা!তবুও ডাক্তারজীর দেশ সম্পর্কিত ব্যাকুলতায় ঋষি অরবিন্দ তাঁর সাথে দেখা করলেন।তিনি জানালেন যে,ডাক্তারজীর মতো তিনিও স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত।
   ডাক্তারজী ফিরে এলেন।তাঁর মাথায় একটি-ই চিন্তা এমন কোনো সংগঠন তৈরী করা,যা নিঃস্বার্থ ভাবে দেশকেই ভালোবাসবে।দেশকে রক্ষা করবে।এই চিন্তারই বাস্তব রূপায়ন আর.এস.এস.প্রতিষ্ঠা ১৯২৫-এ।
  এর আগে ডাক্তারজী ব্যক্তিগত ভাবে যে-সব আন্দোলন করেছেন,সেগুলি বাদ রেখে,আর.এস.এস. চালিত কয়েকটি আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা বেমানান হবে না।

এই ইতিহাস কংগ্রেসী ইতিহাসে পাওয়া যাবে না।

” জঙ্গল সত্যাগ্রহ”-১৯৩০

 ভারতের অরণ্যবাসীরা যুগ যুগ ধরে অরণ্যকেই কেন্দ্র করে তাঁদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেছেন।প্রজন্মান্তর ধরে এই ভাবেই নিজেদের অস্তিত্ত্ব তাঁরা রক্ষা করে এসেছেন।ব্রিটিশ হঠাৎ করেই আইন জারি করল যে,বন থেকে আর গাছ কাটা যাবে না।বন ধ্বংস করা যাবে না।বন থেকে আদিবাসীদের উৎখাত করার এ-ছিল এক চক্রান্ত!বনের উপর নির্ভরশীল অরণ্যবাসীরা পড়লেন মহা আতান্তরে!তাঁদের সবকিছুই অরণ্যকেন্দ্রীক।বিদেশীরা তো তাঁদের অস্তিত্ত্ব সংকটে ফেলছে যে !ডাক্তারজীর নেতৃত্বে আদিবাসীদের একত্রিত করে ১৯৩০ সালের ২১ জুলাই শুরু হল বন বা অরণ্য সত্যাগ্রহ।যা "জঙ্গল সত্যাগ্রহ" নামেই পরিচিত।অসংখ্য স্বয়ংসেবক ও সঙ্ঘকর্তারা এই আন্দোলনে সামিল হন।এগারোটি জায়গায় এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ডাক্তারজীকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে।তাঁকে নয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।জেলে থাকাকালিন তাঁকে দিয়ে ইংরেজ কঠোর পরিশ্রম করাত।তাঁর সাথে আরও একশ জন স্বয়ংসেবককে অ‌্যাকোলা জেলে রাখা হয়েছিল।এগারটি দলের অন্যান্য স্বয়ংসেবকদের চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।ডাক্তারজীর কারাবরণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্দোলন আরও জোরালো আকারে শুরু হয়।হাজার হাজার স্বয়ংসেবকরা বনবাসীদের সাথে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়!

চিমুর অস্তি সত্যাগ্রহ,বিদর্ভ–১৯৪২

  বিদর্ভ এলাকায় সঙ্ঘের খুব শক্তিশালী সংগঠন ছিল তৎসময়ে।স্বাভাবিক ভাবেই বিদর্ভ-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে স্বয়ংসেবকরা তনমনধন  সমর্পণ করেই স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেন।আন্দোলন ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছিল বালি বা অমরাবতী,অস্তি বা ওয়ার্ধা ও চিমুর বা চন্দ্রপুর অঞ্চলে।এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কংগ্রেসের উদ্ধব রাও কোড়েকর,সঙ্ঘকর্তা দাদা নায়েক,বাবুরাও বাঘেড়া ও আন্নাজী।সব চেয়ে কনিষ্ঠ স্বয়ংসেবক বালাজী রাইপুরকার-কে ব্রিটিশ পুলিশ সেদিন নৃশংস ভাবে হত্যা করে।তাঁর অপরাধ ছিল,বালাজী স্বাধীনতার পাতাকা উড়াতে চেয়েছিল ! "বীর পুঙ্গব" ব্রিটিশ-টমি তাঁকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে ! 

এই আন্দোলনের খবর এবং ব্রিটিশ সরকারের কাপুরুষতা বার্লিন রেডিও থেকে প্রচার করা হয়েছিল।
এই আন্দোলন ইতিহাসে “চিমুর-অস্তি আখ্যান” নামে উজ্জ্বল হয়ে আছে।আন্দোলনের তীব্রতায় সেদিন ব্রিটিশ-টমি লেজ গুটিয়ে পালিয়ে ছিল।চিমুরে স্বয়ংসেবকরা একটি স্বাধীন বা সমান্তরাল সরকার গঠন করেন। কয়েক শত স্বয়ংসেবককে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ রাখা হল।মাত্র ১২৫ জনের বিচারের নামে প্রহসণ চালানো হল!
দাদা নায়েক ছিলেন চিমুর খণ্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সঙ্ঘকর্তা।ব্রিটিশ-বিচারে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। “হিন্দু মহাসভা”-র কর্মকর্তা ও ব্রিটিশ ভাইসরয় কাউন্সিলের সদস্য ডঃ.এন.বি.খাড়ের সহযোগিতায় শাস্তি লঘু করে জেল দেওয়া হয়।

সিন্ধ অঞ্চলেও ব্যাপকতা লাভ করে।সকখর শহরের অদূরে সেদিন কয়েক জন স্বয়ংসেবক রেললাইনের ফিসপ্লেট খুলতে ব্যস্ত ছিলেন।তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হিমু কালানি।হঠাৎই ব্রিটিশ সেনা আক্রমণ করে তাঁদের।সবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও হিমু ধরা পড়ে যান। ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ সেনা আদালত হিমুকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়।

পাটনা– ১১/০৮/১৯৪২

পাটনা-বাসীর সাথে সেদিন সমগ্র দেশবাসী একটি ঘটনায় চমকিত হয়ে উঠেছিলেন।মাত্র ছয়জন বালক দেশপ্রেমিক ওই ব্রিটিশ-রাজের পাটনার সেক্রেটারিয়েট অর্থাৎ সচিবালয়ের মাথায় ভারতীয় স্বাধীনতার পতাকা ওড়াতে গিয়েছিল।এবং তাঁদের লক্ষ্যে তাঁরা সফলও হয়েছিলেন। ” মহাশক্তিশালী” ব্রিটিশ পুলিশ তাঁদের গুলি করে খুন করে ! এই ছয় জন বালক বিপ্লবীর মধ্যে দুজন–দেবীপদ চৌধুরী ও জগৎপতি কুমার স্বয়ংসেবক ছিলেন।

  পরাধীন ও স্বাধীন ভারতে বারবারই সঙ্ঘের উপর সরকারী নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নেমে এসেছে।সবক্ষেত্রেই তা তুলেও নিয়েছে শাসকরা।পাটনার ঘটনার অব্যবহিত পরেই সঙ্ঘকে বেআইনি ঘোষণা করে ব্রিটিশ।সঙ্ঘের বিভিন্ন সত্যাগ্রহে যোগ দিয়েছিলেন গণেশ বাবুজী শেনকর।তিনি পূর্বে শোলাপুরের কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন।তিনি গান্ধীজির " ভারত ছাড়ো" আন্দোলনেও যোগ দিয়েছিলেন

পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের আসল রূপ তিনি বুঝতে পারেন।এবং কংগ্রেস ছেড়ে সঙ্ঘের কাজে যোগ দেন।সঙ্ঘের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য আন্দোলন শুরু করেন।১৯৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বরে শ্রী শেনকরের কিছু বক্তব্য প্রকাশিত হয়।তাতে তিনি পরিস্কার ভাবেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।তিনি জানান যে, “আমি ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলাম।সেই সময়ে কংগ্রেস পুঁজিপতি ও জমিদারদের সংগঠন ছাড়া আর কিছুই ছিল না।তারা সরকার পরিচালনা করত।সত্যাগ্রহীদের জন্য কংগ্রেস কোনো নিরাপদ আশ্রয় দিত না।তখন আমরা সঙ্ঘ-কর্মীদের বাড়িতে থাকতে লাগলাম।তাঁরা আমাদের খুশি মনেই বাসস্থান,আহার যোগাতেন।শুধু তাই নয়,কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সঙ্ঘের চিকিৎসকরা আমাদের সারিয়ে তুলতেন।সঙ্ঘের আইনজীবীরা আমাদের হয়ে আদালতে মামলা লড়তেন।এর জন্য কোনোরূপ অর্থ তাঁরা নিতেন না।এছাড়াও,সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকরা আমাদের প্রয়োজনীয় সব কিছুই হাসি মুখে আমাদের সরবরাহ করে যেতেন।তাঁদের দেশপ্রেম,মানবিক মূল্যবোধ ছিল নিখাদ।”
১৯৪২-এর “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনের সময় হাজার হাজার সত্যাগ্রহী কারারুদ্ধ হলেন।ভারতীয় কমিউনিস্ট বাবুরা তখন কোথায় ছিলেন !? স্বাধীনতা প্রাপ্তীর প্রাক্কাল থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত তারা কেন স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন ! তাঁবেদারী ইতিহাসবিদগণ এ-ব্যাপারে নীরব কেন !
আর কংগ্রেসী বাবুরা ! আপনাদের ডাকেই তো লক্ষ লক্ষ নিরীহ ভারতবাসী “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।তাঁরা যখন ব্রিটিশের হাতে বন্দী হলেন,তখন আপনারা গদি বাঁচাতে বন্দী সত্যাগ্রহীদের ব্যাপারে চুপ থাকলেন !

যাক এসব…সবাই কং-কামিয়েনিসদের এতদিনে চিনেছেন !

দেশ বিভাজন কালে পাঞ্জাব,সিন্ধ,এবং পরবর্তী সময়ে জম্মু-কাশ্মীর আক্রান্ত হলে আর.এস.এস. ভারতীয় সেনার পক্ষ হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।জাতীয় পতাকা উড্ডয়ন রাখতে তাঁদের মরণপণ সংগ্রাম দেশপ্রেমিক ভারতবাসী সশ্রদ্ধায় স্মরণে রেখেছেন।শত শত স্বয়ংসেবক তাঁদের পরিবার হারিয়েছেন।জীবিকা হারিয়েছেন।নিজেদের জীবন বিপন্ন করে পাঞ্জাব ও সিন্ধ অঞ্চলের হিন্দু-শিখ-সহ অন্যান্য সনাতনীদের নিরাপদে সরিয়ে এনেছেন স্বয়ংসেবকরা।দিন-রাত এক করে,অমানুষিক পরিশ্রম করে স্বয়ংসেবকরা যখন স্বজাতিদের বাঁচাতে মরিয়া,তখন কংগ্রেসী নেতাদের চুলের ডগাটাও দেখা যায় নি ! তাঁরা তখন নিরাপদ প্রাসাদের মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়ে,ততোধিক বিলাস-ব্যসনে মত্ত !

গোয়া,দমন-দিউ,দাদরা,নগর হাভেলি ছিল পোর্তুগীজদের দখলে।তাদের হঠাতে সঙ্ঘ ছিল প্রতিশ্রুতি বদ্ধ।১৯৫৫ সালে আর.এস.এস. এবং জনসঙ্ঘ একযোগে বৃহত্তম আকারে পোর্তুগীজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করল।রাজাভাই মহাকাল পুলিশের গুলিতে আত্মবলিদান করেন।তৎসহ শত শত স্বয়ংসেবকের জীবন বিপন্ন হয়।
১৯৫৪-র ২ আগষ্ট,পুণের সঙ্ঘচালক বিনায়ক রাও আপ্তের নেতৃত্বে ১০০ স্বয়ংসেবক অতর্কিত আক্রমণ চালান দাদরা-নগর হাভেলির পোর্তুগীজ ঘাঁটিতে।হাভেলি দখলের পর তাঁরা আক্রমণ করেন সিলভাসা ঘাঁটি।এখানে ১৭৫ জন পোর্তুগীজ সেনা আপ্তের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।সেখানে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।পরে এই অঞ্চলের দায়িত্ব ভারত সরকারের হাতে তুলে দেয় সঙ্ঘ।

এটা বলা হয়ে থাকে যে, 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ কিছু করে না।স্বয়ংসেবকরা কিছু ছাড়ে না'! একক একক  স্বয়ংসেবক নিয়েই তো সঙ্ঘ গড়ে উঠেছে! বিন্দু বিন্দু জল কণা নিয়েই তো সিন্ধু।সিন্ধুর গর্জনকে কেউ তো আর জলকণার গর্জন বলে না !
দেশের প্রতিটি বিপদ কালেই সঙ্ঘ দেশবাসীর সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়।প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমান্তে সেনার সহযোগী হিসেবে সঙ্ঘ থেকেছে।ভবিষ্যতেও থাকবে।সঙ্ঘ রাজনৈতিক বিভাজনে বিশ্বাস করে না।১৯৭১-এর যুদ্ধের সাফল্য সঙ্ঘ খোলামনেই দেশবাসীকে দেয়।তৎসহ ইন্দিরার সাহসী ভূমিকারও প্রশংসা করে।দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সময় কেউ আলাদা ভাবে পালনের কথা বলে নি।

   কিন্তু ইন্দিরার বিদেশিনী পুত্রবধূ খুব সহজেই কার্গিল যুদ্ধকে বিজেপির যুদ্ধ বলে থাকেন !

পাকিস্তানের মাটিতে ঢুকে ভারতীয় সেনার সার্জিক্যাল স্ট্রাইককে বিজেপির সাফল্য বলে থাকে কংগ্রেস।ভারতের সাফল্য বলে না।

স্বাধীনতার পর প্রায় ষাট বছর ভারত শাসন করে কংগ্রেস।অথচ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে কংগ্রেস কখনো স্বীকার করে নি।শ্রদ্ধা জানানো তো দূরে থাক !সকল বিশ্ববাসী-ই জানেন যে,স্বাধীন আজাদ হিন্দ‌্ সরকারকে স্বাধীন ভারত সরকার হিসেবে ১৯৪৩-৪৪ সালে মোট নয়টি স্বাধীন রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছিল।নেতাজিকে তারা ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিল। ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদী নেতাজিকে প্রথমবারের জন্য স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য সম্মান দিলেন।


পরাধীন ভারতের শেষ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন।তাঁর হাত থেকেই ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়ে নেহেরুর হাতে আসে।সকলেই জানেন নেতাজি যাতে স্বাধীন ভারতে স্ব-পরিচয়ে ফিরতে না-পারেন,তার জন্য সকল রকমের সু-বন্দোবস্ত নেহেরু করে রেখেছিলেন ! এবং তা করেছিলেন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ পূরণের জন্যই ! গান্ধীজি ( মহাত্মা!) নেহেরু সম্পর্কে অন্তত একটা সত্য কথা অকপটেই বলে গিয়েছেন।সেটা হল –“নেহেরু যতটা না ভারতীয়,তার চেয়েও বেশি ব্রিটিশ !” একথা গান্ধীজি না-বলে,যদি নেতাজি বলতেন তাহলে হয়ত অনেকেরই বিশ্বাস হত না !


তো লর্ড ব্যাটনের সুন্দরী পত্নী লেডি ব্যাটনের সাথে নেহেরুর একটু “মাখো মাখো” সম্পর্ক ছিল।অনেকেই দেখে থাকবেন একটি ঐতিহাসিক আলোকচিত্র যাতে দেখা যাচ্ছে, নেহেরুর মুখে সিগারেট।এবং লাইটার জ্বালিয়ে তিনি লেডি ব্যাটনের সিগারেটটা আগে ধরিয়ে দিয়ে নিজেকে কৃতার্থ বোধ করছেন ! লেডি ব্যাটনের সাথে নেহেরুর লেজ নাড়া স্বভাবটা লর্ড বাবু হয়ত উপভোগই করতেন।গৃহের পোষা জীবের লেজ নাড়া যেমনটা উপভোগ করেন গৃহকর্তা–তেমনটা আর-কি! আর হয়ত বুঝতে বাকি থাকে না,কেন নেহেরুই হলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম মনোনীত প্রধানমন্ত্রী !

স্বাধীনতার “অমৃত মহোৎসব”-এর শুভক্ষণে সকল খ্যাত-অখ্যাত স্বাধীনতা যোদ্ধাদের দেশবাসী অকুন্ঠ চিত্তে স্মরণ-শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে।তাঁদের অবদানকে মস্তকে নিয়ে,তাঁদেরই পদতলে নতমস্তক হচ্ছে।

   : : সুজিত চক্রবর্তী : :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.