চোখ খোলবার সময় হয়েছে

সম্প্রতি জম্মু কাশ্মীরের পুলওয়ামায় পাকিস্তান ও অতঙ্কবাদীদের যৌথ উদ্যোগে যে নৃশংস আত্মঘাতী হামলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৪ জন জওয়ান নিহত হলো, তা নিয়ে ভারত-সহ গোটা বিশ্ব আজ বেদনাহত ও সন্ত্রস্ত। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার পূর্বাপর বিশ্লেষণটি নির্দিষ্ট উদাহরণ-সহ এখানে রাখছি।

কাশ্মীরে জিহাদি হিংসা নতুন নয়। কিছুদিন আগে ২২ বছরের তরুণী ঈশ্বর মুনীর ভাটকে খুন করার পর সেটিকে মান্যতা দেওয়ার যে চেষ্টা হলো তা সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষাবলম্বনকারীদের মাথা নত করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

দীর্ঘদিন ধরেই জম্মু ও কাশ্মীর প্রচার মাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি অতি সাম্প্রতিক ভয়ংকর ও বর্বরোচিত ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরও দিল্লির তথাকথিত ‘লুটিয়েন্স মিডিয়াকে’ সভ্য করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, যদিও কাশ্মীরিরা লজ্জায় তাদের মাথা নত হয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। আতঙ্কবাদীদের সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশিত একটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিও মানুষকে হতভম্ব করে দিয়েছে। ভিডিওতে একটি তরুণী বারবার প্রাণভিক্ষা চাওয়া সত্ত্বেও জেহাদিরা হাত ধরা দূরত্ব থেকে ঠাণ্ডা মাথায় তাকে গুলি করে মারছে। আর একবার নয়, তারা গুলি করছে বারবার। চলে যাওয়ার আগে তারা মৃত মেয়েটির পাশে তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর চর হিসেবে অভিযুক্ত করে একটি চিঠি রেখে যায়।

এই ধরনের মিথ্যা অজুহাত জিহাদিরা নিজেদের ঘৃণ্যতম কৃতকর্মের সমর্থনে সর্বদাই দিয়ে থাকে। এই ধরনের খুন ও পরবর্তীকালে তার ভিডিও প্রকাশ অতীতেও বহুবার হয়েছে। তবে এই প্রথম কোনো নিরস্ত্র মহিলাকে বলি হতে দেখা গেল। এ যাবৎ কাশ্মীরি মেয়েরা নির্বিচারে জিহাদিদের লালসার শিকার হয়ে আসলেও তারা নীরব থেকেছে। এক্ষেত্রে তাদের বীরপুঙ্গব স্বামীদের বাজারি ‘ইজ্জত’ না হলে যে অক্ষুণ্ণ থাকবে না।

সাম্প্রতিক এই বিকৃত মানসিকতার অপরাধ নৃশংসতা ও হিংস্রতার নিরিখে ২০০৯ সালের ‘সোপিয়ান’ ২০১৮ সালে ঘটা ‘রসনার’ অপরাধকে ছাড়িয়ে গেছে। অতীতে দুটি ক্ষেত্রেই সর্বভারতীয় প্রচার মাধ্যমগুলি মিডিয়ার মাধ্যমে বিচার বা পারস্পরিক দোষারোপের মাধ্যমে দেশকে আজা-মৌজ বোঝাবার চেষ্টায় ত্রুটি করেনি।

লক্ষ্য করার বিষয় এই, সাম্প্রতিকতম অপরাধটি নিয়ে মিডিয়ার সম্পূর্ণ বোবার ভূমিকায় অভিনয়, যেমন অস্বস্তিকর তেমনি হতবুদ্ধিকর। প্রশ্ন জাগে প্রচার মাধ্যমের এক আধটা ছাড়া এই ধরনের বাছাইকরা ক্ষেত্রে লম্ফঝম্ফ করা, অথচ নিশ্চিত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সোচ্চার না হওয়াটা কি সন্ত্রাসবাদীদের ভয়ে ?

সূত্র অনুযায়ী নিহত মহিলাটি সম্প্রতি নিকেশ হয়ে যাওয়া ভয়ংকর জেহাদি জিনত উল ইসলামের আত্মীয়া। পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী খুনের কয়েক দিন আগেই তাকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়। আশ্চর্যের কথা, বাড়ির লোকজন এই অপহরণের কথা স্থানীয় থানায় আদৌ জানায়নি। আর একটি বিষয়ও কাশ্মীরিরা অপমানে, দুঃখে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে তা হলো- যেখানে সন্ত্রাসবাদীরা মারা গেলে হাজার হাজার মানুষ শবযাত্রায় শামিল হয় এই হতভাগ্য মেয়েটির ক্ষেত্রে এই শবযাত্রা ছিল নিঃশব্দ। সমগ্র জাতিরই এই মৃত্যুতে শোক অনুভব করার কথা থাকলেও বাস্তবে কিছুই ঘটেনি। সাধারণ নাগরিককে খুন করতে পারলে ‘স্বর্গে যাওয়া (জন্নত)’ যাবে জিহাদিদের এই দৃঢ় সংস্কার কেবল কাশ্মীরের ক্ষেত্রেই বরাবর আবদ্ধ থাকবে না, এটা ভাবলে বাকি ভারত ভুল করবে।

বিস্ময়করভাবে যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা অতীতের ‘রসানার’ ঘটনার ক্ষেত্রে লম্বা চওড়া বক্তব্য রাখার সঙ্গে মোমবাতি মিছিল করেছিলেন, তাদের কেউই একটি নিরীহ মেয়ের এমন হিংস্রতম খুনের কোনো নিন্দা পর্যন্ত করেননি।

সেই সমস্ত ড্রইংরুম বিলাসি জিহাদি সমব্যথীরা বরাবর বলে আসছে যে, কাশ্মীরের সশস্ত্র সন্ত্রাস আদতে আদৌ সন্ত্রাস নয়, তাদের কিন্তু আবার ভাবতে বলছি। তাদের মত অনুযায়ী কাশ্মীরের বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি বহু আপাত বিরোধী ঘটনার জন্য কাশ্মীরিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিল্লির থেকে যোজন ফারাকের। দু’টি কখনই মিলতে পারে না।

রাজনৈতিক ভাবে ভিন্নতা অর্থে একধরনের স্বাতন্ত্র্যবাদ সেই স্বাধীনতাপূর্ব ১৯৩০ থেকেই এখানে লালিত হয়ে আসছে। সেই অর্থে কাশ্মীরি রাজনীতি বরাবরই শেখ আবদুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্সের অভিভাবকত্বে পরিচালিত। যে রাজনীতি চরিত্রগতভাবে নিতান্তই সাম্প্রদায়িক, প্রাদেশিক, এমনকি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ভিত্তিক। এই ক্ষমতাভোগীরা মানতেই চান না যে সমগ্র কাশ্মীরবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা আরও দুটি অঞ্চলের মধ্যে বিস্তৃত, যা হলো জম্মু ও লাদাখ। সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষ অবলম্বনকারীরা নির্দ্বিধায় এড়িয়ে যান যে কেবলমাত্র কাশ্মীরি বলা সমগ্র জনসংখ্যার একটা ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের বাসনা চরিতার্থ করতে যে সন্ত্রাসবাদের বাড়-বাড়ন্ত তা কিন্তু অন্য দুটি অঞ্চলের অকাশ্মীরি জনগণের নিদারুণ ক্ষতি করছে।

আজকের কাশ্মীরি সমাজ সন্ত্রাসবাদীদের মুখোমুখি দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা কখনই জিহাদিদের নিরন্তর হিংসার নিন্দা করেনি। অথচ তারা এটা জানে যে এই জেহাদের অন্তরালে উপত্যকায় একটি মৌলবাদী ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত হচ্ছে। কর্মরত পুলিশ আধিকারিক বা পরিবারের সদস্যদের হত্যা, ছুটিতে বাড়ি যাওয়া সৈনিক, নিরীহ তরুণ, জাতীয়তাবাদী কর্মী, বিভিন্ন পেশায় জড়িত নাগরিক বা সাংবাদিকদের নির্বিচার হত্যা, তারা স্বধর্মীয় হলেও সুশীল সমাজ বা গর্বিত নাগরিকদের কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশিত প্রতিবাদ কোনোদিন শোনা যায়নি। মাছ যেমন জল ছাড়া বাঁচে না এই সন্ত্রাসবাদীরাও কিন্তু নাগরিক সমর্থন ব্যতিত দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। অপরাধীদের যারা সমর্থক তারাও অপরাধীদের মতোই সমান দায়ী।

প্রখ্যাত সামরিক বিশেষজ্ঞ নীরব ভাটনগর বলেছিলেন, যে সমাজ নির্বিচার হিংসার সমর্থন করে নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চায়, তারা কিন্তু নিজের অজান্তেই এক সময় এমন একটা অদৃশ্য জালে জড়িয়ে যায় যেখান থেকে ভবিষ্যতে তারা আর বেরোতে পারে না। এই জাল যখন একবার বোনা হয়ে যায় তখন কী সাধারণ মানুষ, কী সন্ত্রাসী, কী রাজনীতিক সকলেই একটা সময় এতে অন্তরীণ হয়ে পড়ে।

হ্যাঁ, মৌলানা, সন্ত্রাসবাদী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, মিডিয়া, বিদেশি শক্তি, মানবাধিকার কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সকলেই এক যোগে এই জালে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। কেননা তাদের সকলেরই নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করার থাকে। স্বার্থ চরিতার্থ করার একমুখী প্রকল্পে স্থির থাকায় তারা জনতার ওপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার গ্রাহ্যই করে না। জনতার বড়ো অংশ জ্ঞানে অজ্ঞানে অংশীদার হয়ে যাওয়ার ফলে এক সময় জঙ্গিরাও এই জালের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বস্তুত তারা এটিকে নিজ সুবিধার্থে হাইজ্যাক করে নেয়। আর এরই মাধ্যমে ছড়াতে থাকে মৌলবাদী ইসলামের বিষ।

আগেই বলা হয়েছে ঢালাও হিংসা ছড়ানো ছাড়াও জিহাদিরা কাশ্মীরি মেয়েদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করতেও অভ্যস্ত। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের অঙ্গ key pad-এর চল কাশ্মীরে খুব বেশি। দেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় কাশ্মীরিদের অংশগ্রহণ জনসংখ্যার অনুপাতে বিশাল। এই মাধ্যমকে ব্যবহার করে নিরাপত্তারক্ষীদের জিহাদিদের ওপর অত্যাচারের অসংখ্য জাল ভিডিও নেট ছেয়ে থাকে। কিন্তু নিরীহ মেয়েদের ওপর জিহাদিদের নির্মম অত্যাচারের কোনো প্রমাণ্য ভিডিও বা খবর কখনই নজরে পড়বে না। কর্নেল ভাটনগর বলেছেন, কাশ্মীরি মেয়েরা সন্ত্রাসবাদীদের লাম্পট্য, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অপহরণ, জবরদস্তি শাদি করা আর যখন খুশি তালাক দেওয়ার মতো বিকৃত কাজকর্মের সহজলভ্য শিকার। মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত বহু তরুণীকে তারা নিজেদের লালসার বলি করে। এদের স্বামীরা, অভিভাবকরা নীরব থাকে হয় ভয়ে, নয়তো টাকার লোভে। মোদ্দাকথা কাশ্মীরি পুরুষরা আজ জেহাদিদের কাছে নপুংসকে পরিণত হয়েছে। এই পরিণতি যারা মেনে নিতে পারেনি এমন বহু পরিবার (যাদের মধ্যে আতঙ্কবাদী দ্বারা গর্ভবতীও আছে) যাদের সরকারি সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি। ইসলামের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে (আজাদি বারাহি ইসলাম) এই ব্যাভিচার কতদিন চলবে?

ভারতের অবশিষ্টাংশ কি এ থেকে চোখ ফিরিয়ে কাটিয়ে দেবে? দেশের নারীদের রক্ষা করা দেশের যৌথ দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে জিহাদিদের কাছে কাশ্মীর একটা ‘launching pad’ মাত্র, যেখান থেকে তারা নবি কথিত চরম ‘ঘজওয়া এ হিন্দ’ প্রকল্পকে সফল করতে বদ্ধপরিকর। ভারতের হাতে সময় কম।

অনিল গুপ্ত

(জম্মুস্থিত নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিশ্লেষক)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.