বাংলায় মর্যাদা পুরুষোত্তম ভগবান রামের উপস্থিতি সুপ্রাচীন

রাম আদতে কৃষ্ণ হচ্ছেন বৈষ্ণব, তিনি বাংলার দেবতা নন। আর দূর্গা শক্তির দেবী ই বাংলার প্রকৃত দেবতা তাই রাম নবমী বাংলার উৎসব নয়, বরং বিজেপি আরএসএসের চক্রান্তে এটা উত্তর ভারতের গোবলয় থেকে বাংলায় আমদানী করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস দলটি। এই দলটি অজকাল তাদের নাম থেকে ‘কংগ্রেস’ কথাটি একপ্রকার অলিখিত ভাবে বাদই দিয়ে দিয়েছে। ভগবান রামচন্দ্র শরৎকালে অকাল বোধন করে বাংলার দুর্গাকে আহ্বান করেছিলেন এই সত্যটি যেন অবলীলায় ভুলে গেছেন তৃণমূল কংগ্রেস দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্তা ব্যক্তিরা।

সম্ভবত আদি শঙ্করাচার্যের পরে বহুবছর ধরে বাংলার জনমানসে ও সংস্কৃতিতে বৈষ্ণববাদ বিস্তৃত। আর তা ঘটেছিল শাক্ত তান্ত্রিক সাধনাকে গ্রহণ করার অনেক আগেই। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মাধবাচার্যের দ্বৈত বৈষ্ণববাদ উডুপি থেকে বিজয়নগর রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত হয়ে নিলাচল (পুরি, ওড়িশা) উপকূলের মধ্য দিয়ে পূর্ব পর্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে ছিল। মাধুভেন্দ্র পুরি, ঈশ্বর তীর্থ এবং শ্রী চৈতন্য ছিলেন এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে। মাধবাচার্যের চিন্তাধারার ঢেউ আছড়ে পড়ার অনেক আগে নবম শতকের গাঙ্গেয় দক্ষিণ বঙ্গে এবং রাঢ়বঙ্গের মল্ল রাজারা ইতিপূর্বেই বৈষ্ণবমতবাদ গ্রহন করেছিলেন।

আরএসএসের অনেক আগেই বাংলাতে শ্রী রামকে শ্রদ্ধা জানানো প্রচলন ছিল। আমরা একটু দৃষ্টি দিলেই তা দেখতে পাব। আসুন আমরা দেখি তখনকারদিনে রাম নবমী উদযাপনের বাঙালি হিন্দু ঐতিহ্যগুলিকে।

 বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর রাম নবমীর মেলা এবং বাউল আখড়া 

বাঁকুড়া জেলার একটি ছোট শহর সোনামুখী। সেখানকার রাম নবমীর মেলা একটি ঐতিহ্যবাহী ঘটনা। এই দিনে বাউলদের একটি সমাবেশ বসে, ভ্রাম্যমান কবি এবং বাংলার গায়ক, এবং দর্শকরা এখানে উপস্থিত হন। এটি যেন কেন্দুলির জয়দেবের মেলার ক্ষুদ্র সংস্করণ। সোনামুখির রাম নবমীর মেলাটি পুরনো বঙ্গীয় বৈষ্ণব প্রবাহের সাথে সাঁওতালি ও রাজওয়ারি সংস্কৃতির একটি অনন্য সমন্বয়। যা মেলাকে সমৃদ্ধি অর্জন করতে সাহায্য় করেছে।

 হুগলির গুপ্তিপাড়ার রামচন্দ্র মন্দির 

অষ্টাদশ শতকের ‘চার চালা’ মন্দিরের অংশবিশেষ শ্রী রামকে পূজা করার বাংলার প্রথাটির নমুনা হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর এটি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোং’ এর সময়কালের নিদর্শন, যা কলকাতায় স্থিত কোম্পানীর ব্যারাক থেকে বেশি দূরে নয়। এই পোড়ামাটির মন্দির কমপ্লেক্সটিতে রামচন্দ্র মন্দিরের সাথে একটি কৃষ্ণচন্দ্র, একটি বৃন্দবন চন্দ্র এবং একটি চৈতন্য মন্দির রয়েছে। এই চারটি মন্দিরের প্রতিটি সময় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছিল। রামচন্দ্র মন্দিরটি শেওড়াফুলির রাজা হরিশচন্দ্র রায় নির্মাণ করিয়েছিলেন।

 মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার রঘুনাথ মন্দির 

রাজপুত বংশের রাজা চন্দ্রকেতু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ছোট শহর চন্দ্রকোণা। তিনি ইটের প্রাচীন মন্দির নির্মাণ করেছিলেন মল্যনাথ এবং লাল জী (উভয় গৃহ দেবতা কৃষ্ণ ) যা রঘুনাথ জী (রাম) কে উত্সর্গীকৃত। বলা হয় যে এই মন্দিরগুলি সপ্তদশ শতাব্দীতে বর্ধমানের রাজা কৃট চাঁদ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, যারা চন্দ্রকেতুর পরবর্তী উত্তরাধিকারীকে উচ্ছেদ করেছিল। রঘুনাথ মন্দির প্রায় ৫২ ফুট লম্বা এবং ওড়িশার দেউল কাঠামোর ন্যায়, কিন্তু এখন তা এক ধ্বংসাবশেষ মাত্র।

 হাওড়াতে রামরাজাতলার রাম মন্দির ও রাম নবমী মেলা 

আরেকটি আকর্ষণীয় রাম মন্দির, যার উপরে হাওড়া শহরের রামরাজাতলার নামকরণ করা হয়। এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি নির্মাণ যা বামন অবতার এবং সাবিত্রী-সত্যবানের জন্য নির্মিত অন্য দুটি মন্দির। রাম নবমী সময় থেকে চলতে থাকা দীর্ঘ চার মাসের উৎসব শ্রাবণ মাসে শেষ হয়। প্রায় ২৫০ বছর আগে, জমিদার অযোধ্যা রাম চৌধুরী তাঁর ব্যক্তিগত জমিতে এই রাম মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। রামায়ণ এবং মহাভারতের বিভিন্ন পর্বের চিত্রকলার চিত্রকর্ম মন্দিরের দেয়ালের উপর নির্মিত। রাম নবমী উদযাপন ও রামরাজাতলার মেলা শতাব্দী পুরানো এবং স্থানীয় ব্যবসা আকর্ষণ বিন্দু।

 নদিয়ার  কৃষ্ণগঞ্জের রাম সীতা মন্দির 

নাদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জে অষ্টাদশ শতকে লাল ইট এবং মর্টার মণি সহযোগে নির্মিত রাম সিতা মন্দির, রাজরাজেশ্বর শিব মন্দির ও রাগেশ্বর শিব মন্দির শিবনিবাসের তিনটি অংশ হিসেবে ১৭৬২ সালে নির্মিত হয়েছিল। এই চারচালা মন্দিরটির উপরের দিকে একক রত্ন স্থাপত্য দেখা যায়। মর্য্যাদা পুরুষোত্তম রামের প্রতিদিনের উপাসনার একটি সক্রিয় কেন্দ্র এটি । বর্গিদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য কৃষ্ণগঞ্জ নগরটি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সাময়িক রাজধানী হিসেবে কৃষ্ণনগর থেকে স্থানান্তরিত করেছিলেন। মন্দিরটিতে পাথরের শ্রী রাম ও সীতা দেবীর অষ্টধাতুর মূর্তি রয়েছে।

 পূর্ব মেদিনীপুরের তামলুকের রামজিউ দেউল এবং ঘাটালের সীতা রাম মন্দির 

মেদিনীপুরের তামলুক (পুরানো নাম, তাম্রলিপ্ত) শহরের হরিরবাজার এলাকায় ওড়িশার দেউল কাঠামো গঠিত রামজিউ মন্দিরটি অষ্টাদশ শতাব্দীর কাছাকাছি তামলুক রাজাদের দ্বারা নির্মিত। এটি একটি ইট এবং পাথর নির্মিত চারচালা মন্দির। ঘাটালের খড়ার এলাকায় সিতা রাম দেউল টেরাকোটা স্থাপত্যের আরেকটি গৌরব। কিন্তু এই মন্দিরটির বিশেষত্ব এর তেরোটি রত্ন। এই মন্দিরটি ১৮৬৫ সালে মাজি জমিদারদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।

 সাবেক মেদিনীপুর জেলার চিরুলিয়ার রামচন্দ্র মন্দির 

‘বারো চলা’ মন্দির নামে পরিচিত অর্থাৎ ১২ টি চালা যুক্ত মন্দিরটি একটি রাম মন্দির যা ১৮৪৩ সালে টেরাকোটা কাঠামোতে নির্মিত হয়েছিল। এটি বাংলার চারটি বারো-চালা মন্দিরের মধ্যে একটি।

 মুর্শিদাবাদে রঘুনাথজী মন্দির নাশিপুর আখড়ার 

নাশিপুর মুর্শিদাবাদ জেলার ভগবানগোলা ব্লকের একটি গ্রাম। নাশিপুর রাজবাড়ী (রাজপ্রাসাদ) একটি বিশিষ্ট ভ্রমণ গন্তব্যস্থান। এটি মূলত নাশিপুর রাজ পরিবারের রাজা দেবী সিংহ দ্বারা নির্মিত এবং ১৮৬৫ সালে রাজা কির্তি সিংহ বাহাদুর দ্বারা পুননির্মিত হয়েছিল। জাফরগঞ্জের আখারা নাশিপুর রাজবাড়ী কমপ্লেক্সের নিকটবর্তী। সেটিও একটি পর্যটকদের আকর্ষণ কেন্দ্র। আখারা রাঘুনাথ জী মন্দির এখনও একটি সক্রিয় উপাসনার স্থান।

 মেদিনীপুরের রাউতারার সীতা রামজী মন্দির 

রাউতারা শহরের ঘোষপাড়ার সীতা রামজী মন্দিরটি ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। ঐতিহ্যবাহী আট-চালা মন্দিরটিতে টেরাকোটা ও ইটের কাজ দেখা যায়। এই সীতা-রাম মন্দিরটি দৈনিক উপাসনার জন্য জমিদার ঘোষ পরিবার দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। মেদিনীপুরের অন্যান্য স্থানেও রাম মন্দিরগুলির প্রাচুর্য রয়েছে, যেমন মাজিপাড়ার সীতা রাম মন্দির বা জনার্দনপুরের সিতা রাম জিউ দেউলের মতো তেরো-রত্ন।

 নদীয়ার মাটিয়ারী রাম সিতা মন্দির ও গ্রামীণ রাম নয়মী উদযাপন 

মাটিয়ারী গঙ্গা নদীর ধারে দীনহাটা বাজারএর কাছে জুড়ে রয়েছে। মাটিয়ারী জমিদারি প্রশাসনিক কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে মাটিয়ারী রাম সিতা মন্দিরটি কাটোয়া-দিনহাটা-মাঝেরগ্রাম এলাকার জনগণের কাছে নিজস্ব আবেদন নিয়ে অবস্থান করছে।এই স্থানটি কিংবদন্তী বিশেষত্ব স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে।

ঐতিহাসিক রাম নবমী উদযাপন ও মেলা এই এলাকার কয়েক হাজার গ্রাম ও ছোট শহর থেকে হাজার হাজার লোককে আকর্ষণ করে। মন্দিরটিতে ভগবান রাম, সিতা দেবী ও লক্ষ্মী মাতার মূর্তি রয়েছে।

 পুরুলিয়ার গড় পঞ্চকোট - রাম মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ 

রাজপুত বংশের দামোদর শেখর প্রায় ৯০ খ্রিস্টাব্দে পুরুলিয়ায় সিং দেও রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি এই অঞ্চলের পাঁচটি সামন্ত প্রধান সমন্বয় করেছিলেন এবং এভাবেই এই স্থানটি পঞ্চকোট নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। এটি পঞ্চকোট থেকে, স্থানীয় পাঞ্চেত বাঁধের নামকরণ করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, পঞ্চকোট রাজত্ব একবার দামোদরের জলের নিচে ডুবে গিয়েছিল। পঞ্চকোট সাম্রাজ্যের ষোড়ষ শতাব্দীতে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের হাতে পরাজিত হয়েছিল এবং পরে বর্গি আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিল। মল্ল রাজাদের দখলকালে, পঞ্চকোট রাজা বহু মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। যার মধ্যে পঞ্চরত্ন মন্দির যা একটি কৃষ্ণ মন্দির এবং পাথর খোদিত রাম মন্দির উল্লেখযোগ্য। যদিও অধিকাংশ মন্দির, প্রাসাদ এবং দুর্গ এখন তাদের ধ্বংসাবশেষে পরিণত।

মেদিনীপুরের রামচন্দ্র মন্দির ও নাড়াজোল রাজ প্রাসাদের রাম নবমী 

প্রাচীন বাংলায় ক্ষত্রিয় রাজাদের রাজবংশ ও সামন্তীয়দের মধ্যে মধ্যে ভগবান রামকে পূজা করার প্রচলন ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। মেদিনীপুর ও নাদিয়া জেলা সম্ভবত বাংলার সর্বাধিক প্রচীন রাম মন্দির ধারণ করে ছিল।

নাড়াজোল রাজবাড়ী ঘাটাল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নাড়াজোল রাজ্যের রাজবাড়ী ৬০০ বছরের পুরানো প্রাসাদ রামচন্দ্র এবং সীতা দেবীর মন্দির এবং রামধুন ও পালা নাটকের (কবিগান) প্রতিযোগিতার চল রয়েছে। ১৮১৯ সালে নাড়াজোল রাজা মোহনলাল খান,১ লাখ টাকা ব্যায়ে অযোধ্যার রামজম্মভূমি থেকে পাথর এনে এই রাম মন্দির নির্মাণ করান।

এটা শোনা যায় যে, রাজা উত্তরাধিকারী ছিলেন না, মন্দির নির্মাণের পর পুত্র সুখে সুখী হয়েছিলেন। তিনি রাম নবমী উপলক্ষে রাম রথ যাত্রা শুরু করেছিলেন, যার রথ এখনো প্রাঙ্গনে সংরক্ষিত।

বাংলার প্রাচীন হিন্দু মন্দিরগুলির বেশিরভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। বখতিয়ার খলজী থেকেশুরু করে নবাবদের পর্যন্ত মুসলিম শাসকদের আক্রমণের কারণে সপ্তদশ শতকের আগে নির্মিত এক মন্দিরগুলি কে খুঁজে পাওয়া যায় না। কালপাহাড়ের মতো রূপান্তরিত হওয়ায় গৌড় সুলতানের সেনাধিপতির হাতে আমাদের হিন্দু মন্দিরগুলির ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ভয়ঙ্কর গল্প অনেকেই শুনেছেন।

স্বাধীনতার পর নির্মিত কলকাতার বিড়লা রাম মন্দির, দুর্গাপুরের রাম মন্দির রয়েছে যা ভক্তদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল। ষোড়ষ শতকের শেষের দিকে শুরু করে আরএসএসের জন্ম পর্যন্ত আরো কয়েকটি রাম মন্দির গড়ে উঠেছে,যেমন পাটুলির কাছে পিলা পূর্ব বর্ধমান বা পুরানো মালদা ও মুর্শিদাবাদে এখনও তারা স্বমহিমায়উপস্থিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.