ছত্রপতি শিবাজী : এক বীরগাথা

ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে মারাঠা জাতির অভ্যুদয়ের প্রধান নায়ক ছিলেন ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ। তার সুযোগ্য নেতৃত্ব, সামরিক দক্ষতা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও মহারাষ্ট্রের ভৌগোলিক পরিবেশে বহুধা বিচ্ছিন্ন মারাঠা গোষ্ঠীসমূহকে একসূত্রে সংশ্লিষ্ট করে তাদের ইতিহাসগত ভাবে প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব একমাত্র শিবাজীর। শিবাজীর কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র ছিল বর্তমানে মহারাষ্ট্রের পুনে ও তার সন্নিহিত অঞ্চল। ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে এই অঞ্চল কৃষিকাজের পক্ষে অত্যন্ত প্রতিকূল এবং দুর্গম গিরিপথ-সহ সুউচ্চ পাহাড় সমন্বিত এক প্রতিকূল পার্বত্য এলাকা। এই দুর্গম পার্বত্য এলাকাকে কেন্দ্র করে সমকালীন মুঘল ও বিজাপুর বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে যে মারাঠা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তার ভিত্তি এতটাই মজবুত ছিল যে তাকে অবদমিত করা মুঘল শক্তির পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে শিবাজী ১৬২৭ সালে ১০ এপ্রিল পুনা জেলার উত্তরে শিবনের পার্বত্য দুর্গে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতা জীজাবাঈ তার প্রত্যাশিত সন্তানের মঙ্গল কামনায় শিবা-ভবানী দেবীর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন ও সেই কারণে এই দেবীর নামানুসারে ভূমিষ্ঠ সন্তানের নাম রাখেন শিবা বা শিবরাজে। শিবাজীর পিতা শাহজী ভোসলে প্রথমে আহম্মদনগর রাজ্যের মালিক অম্বরের অধীনে, সাময়িককালের জন্য মুঘলদের অধীনে এবং ১৬৩৩ সালে আহম্মদনগর রাজ্যের পতনের পর বিজাপুর। রাজ্যের অধীনে সেনাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৬৩০ থেকে ১৬৩৬ সাল পর্যন্ত শাহজীর যাযাবর জীবন ও তুকাবাঈ মোহিতে নামে আর একজন নারীকে বিবাহ করার ফলে। শিবাজী তার পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে ১৬৩৬ সালে মুঘল-বিজাপুর চুক্তির মাধ্যমে শাহজীর পুনা-সহ তার অধিকৃত সকল স্থানের কর্তৃত্ব হস্তচ্যুত হয়েছিল, ফলে শিবনের দুর্গ থেকে শিবাজী বঞ্চিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে শাহজী বিজাপুরের অধীনে কাজ করার সুবাদে বিজাপুরের থেকে জায়গির হিসেবে পুনা জেলার চাকন থেকে ইন্দাপুর ও শিরওয়াল পর্যন্ত অঞ্চ ল লাভ করেন। যেহেতু মুঘল-বিজাপুর চুক্তি অনুযায়ী শাহজী মহারাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, তাই ওই জায়গির অঞ্চলের প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য শাহজী তার নাবালক পুত্র শিবাজীর অভিভাবক হিসেবে দাদাজী কোণ্ডদেবকে (মালথানের পূর্বতন কুলকার্নি) নিয়োগ করেছিলেন।

জীজাবাঈ শিবাজীকে নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে জীবন অতিবাহিত করার দরুন তার মধ্যে আধ্যাত্মিকতা গভীরতর হয়েছিল যা তার পুত্রের মধ্যে পরিব্যাপ্ত করেছিলেন। পিতা, ভ্রাতা, ভগিনীদের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বড়ো হয়ে ওঠার দরুন মা ও পুত্রের মধ্যে স্নেহ গভীরতর হয়েছিল এবং মায়ের প্রতি শিবাজীর ভালোবাসা প্রায় আরাধ্য দেবীর উপাসনার পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছিল। বাল্যকাল থেকে শিবাজী স্বাবলম্বী ও কষ্টসহিষ্ণু হওয়ায় স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী ছিলেন। তাই স্বাধীনভাবে রাজ্য গঠনের ভাবনা তার স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে। দাঁড়ায়। প্রথাগতভাবে শিবাজী বাল্যকালে দাদাজী কোণ্ডদবের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং অল্পকালের মধ্যে মুষ্টিযুদ্ধ, অশ্বারোহণ। ও সামরিক শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এছাড়া প্রাচীন ভারতের দুই মহাকাব্য শিবাজীর জীবন গঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেইসময় পুনা জেলা আহম্মদনগর-মুঘল সংঘাত ও পরবর্তীকালে বিজাপুর বাহিনীর আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং এক নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজমান ছিল। শক্তিশালী মারাঠা প্রধানরা দুর্বল মারাঠা। প্রধানদের নিজ গ্রাম থেকে উৎখাত করত। কৃষকরা প্রায়শইলুণ্ঠনের শিকার হতো কোনও শক্তিশালী প্রশাসন ও সামাজিক শৃঙ্খলা না থাকার দরুন। কোনও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থা ও আইনি অধিকারের অনুপস্থিতি ছিল প্রাকশিবাজী-মহারাষ্ট্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই প্রেক্ষাপটে প্রথমে। দাদাজীকোণ্ডদেব জনমাবশূন্য পুনা অঞ্চলকে। পুনরায় জনবসতিপূর্ণ করে তুলতে ব্যবস্থা। করেন ও আইন-শৃঙ্খলা পুনপ্রবর্তন করেন। শিবাজী দৃঢ়ভাবে একজন সৎ বিচারক ও শক্তিশালী প্রশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় গ্রামবাসীদের একজন তথ্য অনুসন্ধানকারী জুরির (মাহাজার) পরমর্শ গ্রহণের প্রাচীন পদ্ধতি অনুসরণ করে নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্ত প্রদান করা হতো। এইভাবে শিবাজী মহারাষ্ট্রব্যাপী এক সামাজিক চাহিদাকে দারুণভাবে পূরণ করেছিলেন, যা প্রাথমিকভাবে তার সফল উত্থান সাধারণ মানুষের জনসমর্থন লাভ করেছিল। শিবাজীর কর্তৃত্ব তাই প্রথমে সাধারণ মানুষের হৃদয় জয়ের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়েছিল।

এই ভাবে মহারাষ্ট্রের জনজীবনে স্বাধীনতার উদ্দীপনা প্রজ্বলিত হয়েছিল এবং দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়কমুসলমান শাসনের অধীনে থাকার পর এক-একজন স্বাধীনতা-সৈনিক হিসেবে নিজেদেরকে তুলে ধরার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল।

দাদাজী কোণ্ডদেবের অধীনে পুনা জেলার পশ্চিমাংশে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সমান্তরাল ৯০ মাইল দীর্ঘ ও ১২ থেকে ২৪ মাইল প্রশস্ত ‘মাওল’ অঞ্চলটি শিবাজীর দখলে এসেছিল। এই মাওল অঞ্চল থেকে শিবাজী অনেক সমরাধিনায়ক ও সৈন্য। নিয়োগ করেছিলেন। বস্তুত শিবাজীর রাজ্যগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ১৬৩৪ সালে আহম্মদনগরের শেষ সুলতানের অভিভাবকত্বের দরুন শাহজী বিজাপুরের। সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে (১৬৩৩ সালে) জুনার, শাহগড়, নাসিক, ত্রিম্বক, চাকন, চামারগোণ্ডা, কোঙ্কনের তিন-চতুর্থাংশ যে অঞ্চলগুলি লাভ করেছিলেন, ১৬৩৬ সালে মুঘলরা বিজাপুরের উপর চাপ সৃষ্টি করে নতুন চুক্তির মাধ্যমে শাহজীকে ওই অঞ্চলগুলি থেকে বিতাড়িত করা হয়। শাহজীর উত্তরাধিকারী হিসেবে শিবাজী ওই অঞ্চলগুলিকে পুনরুদ্ধার করার শপথ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। ঐতিহাসিক যদুনাথ। সরকারের মতে, ‘যে তরবারি যেভাবে ওই অন্যায় চুক্তিকে অনুমোদন করেছিল, শিবাজী তরবারির দ্বারা সেই চুক্তিকে সেভাবেই বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

১৬৪৭ সালে দাদাজী কোণ্ডদেবের মৃত্যুর আগে থেকে শিবাজী তার রাজ্যগঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে শুরু করেন। ১৬৪৬ সালে তিনি বিজাপুরের থেকে সংঘাত। ছাড়াই তোরনা দুর্গ দখল করে নেন। এই দুর্গের পাঁচ মাইল পূর্বে রাজগড় নামে এক নতুন দুর্গের নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তী দু’বছর বিজাপুরের সুলতানের অসুস্থতার সুযোগে শিবাজী পুনের নিকট চাকন নামে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করেন। এছাড়া বারামতি ও ইন্দাপুর দুর্গের। আধিকারিকরা শান্তিপূর্ণভাবে শিবাজীর কর্তৃত্ব। স্বীকার করে নেয়। ১৬৪৮ সালে মহাদজী। নীলকণ্ঠ রাওয়ের উত্তরাধীকারীদের থেকে সুকৌশলে শিবাজী গুরুত্বপূর্ণ পুরন্দর দুর্গ দখল করেন। শিবাজীর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সম্প্রসারণের পথে বিজাপুরের থেকে প্রাপ্ত মোরে পরিবারের অধীন জাওলি রাজ্য বাধা হয়ে দাঁড়ালে। শিবাজী এক্ষেত্রেও সুকৌশলে চন্দ্ররাও মোরে ও তার উত্তরাধীকারীদের হত্যা করে ১৬৫৬ সালে জাওলি দুর্গ ও রাইরি অঞ্চল দখল করেন। জাওলির দু’মাইল পশ্চিমে প্রতাপগড় নামে শিবাজী একটি দুর্গ তৈরি করেন যেখানে তাঁর আরাধ্য দেবী ভবানীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। যেহেতু তুলজাপুরের প্রাচীন ভবানী মন্দিরে যাওয়া সহজসাধ্য ছিল না। জাওলি দুর্গ দখলের পর ১৬৫৬’র এপ্রিলে পার্বত্য দুর্গ রায়গড় দখল করেন যা শিবাজীর রাজধানীতে পরিণত হয়। একই বছর তিনি সুপা দুর্গ দখল করেন পুনে অঞ্চলের পূর্বভাগ সুরক্ষিত হয়। এছাড়া তিনি একই অঞ্চলে রোহিদা ও পুনের উত্তর-পশ্চিমে টিকোনা, লোহগড় ও রাজমাছি দুর্গ দখল করে নিজ শক্তিবৃদ্ধি করেন। ১৭৫৬ সালের নভেম্বরে বিজাপুরের সুলতান মহম্মদ আদিল শাহ মারা গেলে দাক্ষিণাত্যে অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা থেকে শিবাজী লাভবান হয়েছিলেন।

১৬৫৬ সালে দাক্ষিণাত্যে ঔরঙ্গজেবের ভারপ্রাপ্ত বিজাপুরের অংশ কল্যাণ অবরোধের সুযোগে শিবাজী মুঘল সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে জুন্নার নগর আক্রমণ করে প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। ১৬৫৭-এর শেষের দিকে শিবাজী জুন্নার নগরের ফৌজিদার মুহম্মদ ইউসুফকে পরাজিত করে কল্যাণ নগরটি দখল করেন ইতিমধ্যে বিজাপুরের সুলতান মুঘলদের সঙ্গে সমঝোতা করলে শিবাজী এককভাবে মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিরর্থক মনে করেন, ফলে শিবাজী মুঘলদের সঙ্গে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্কে আগ্রহ দেখান। কিন্তু ঔরঙ্গজেব শিবাজীকে বিশ্বাস করতেন না।

১৬৫৭ সালে শিবাজী কল্যাণ ও ভিওয়ান্ডি সহজেই অবরোধ করেন এবং কল্যাণ দখলের দখলের সময় শিবাজী সেনাপতি আবাজী সোনদেবকে সেখানে। প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করেন। তখন আবাজী একজন সুন্দরী মুসলমান নারীকে বন্দি করে নিয়ে এলে শিবাজী বলেছিলেন, “যদি আমার মা জীজাবাঈ তোমার মতো সুন্দরী হতেন তাহলে আমাকেও সুদর্শন দেখতে হতো। এইভাবে শিবাজী নিজের মায়ের সঙ্গে ওই নারীর তুলনা করে, অলংকার ও বস্ত্র প্রদান করে ৫০০ অশ্বারোহীর নিরাপত্তা-সহ বিজাপুরে প্রেরণ করেছিলেন। এই নারী কল্যাণের পূর্বতন বিজাপুর সুবেদার মুল্লা আহমদের পুত্রবধূ ছিলেন। রক্ষণশীল ঐতিহাসিক কাফি খান নারীর প্রতি শিবাজীর সম্মান প্রদানে। নীতিপরায়নতার প্রশংসা করেন। ১৬৫৯ সালের শেষদিকে শিবাজী সমগ্র পুনা অঞ্চল, উত্তর সাতারা জেলা এবং কোলাবা ও থানে জেলার অর্ধাংশে কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

১৬৫৯ সালের মধ্যে বিজাপুরে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদের নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে বিজাপুর সুলতান শিবাজীর বিরুদ্ধে আফজল খাঁর নেতৃত্বে পশ্চিমঘাট অঞ্চলে ১০ হাজার সেনা প্রেরণ করে। মহারাষ্ট্রের অভিমুখে যাত্রাকালে আফজল খাঁ হিন্দ তীর্থস্থানগুলিকে বিশেষত মহারাষ্ট্রের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থক্ষেত্র পনটারপুর লুঠ করে অপবিত্র করে যা পতোন্মুখ বিজাপুর রাজ্যের মুসলমান সাম্প্রদায়িক রক্ষণশীলতাকে তুলে ধরে। এর ফলে আফজল খাঁ স্থানীয় দেশমুখের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়। আফজল খাঁর সেনা যেখানে উন্মুক্ত প্রান্তরে যুদ্ধে দক্ষ ছিল সেখানে গেরিলা যুদ্ধে পটু শিবাজীর সেনাদল জাওলির অরণ্যে মোতায়েন থাকার দরুন আফজল খাঁর সেনাদলকে পার্বত্য গিরিপথের মধ্যে দিয়ে চলাচলের সময় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অন্যদিকে দুর্গে শিবাজীর রসদও ফুরিয়ে আসার দরুন উভয়পক্ষ সমঝোতায় রাজি হয়। ঠিক হয় শিবাজী আফজল খাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রতাপগড় দুর্গের নীচে যা কৌশলগত দিক থেকে শিবাজীর অনুকূল ছিল। সাক্ষাতের সময় শিবাজী ও আফজল খাঁ উভয়েই সশস্ত্র অবস্থায় হাজির হয়েছিলেন। শিবাজীর দিক থেকে আফজল খাকে সন্দেহ করার কারণ ছিল। কারণ এক দশক আগে একই পরিস্থিতিতে আফজল খাঁ এক হিন্দু সেনাধ্যক্ষকে বন্দি করতে এই ধরনের সাময়িক যুদ্ধবিরতির অনুষ্ঠান অমান্য করেছিল। শিবাজী তার পোশাকের আড়ালে লোহার বর্মের আচ্ছাদন, পাগড়ির ভিতরে ধাতবমস্তক আচ্ছাদন এবং এক হাতে ছোটো তরবারি ও অন্য হাতে ‘বাঘনখ’ পরে এসেছিলেন। আফজল খাঁ আলিঙ্গনের অভিনয় করে শিবাজীকে পিষে মারার চেষ্টা করলে বাঘনখ দিয়ে আফজল খাঁর পেটের নাড়িভুড়ি বের করে দেন এবং তরবারির এক কোপে আফজল খাঁর মাখা কেটে ফেলেন।। আফজল খাঁকে হত্যার পর সংকেতের সঙ্গে সঙ্গে শিবাজীর সেনাবাহিনী বিজাপুর বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের হত্যা করে। আফজল খাঁকে হত্যার এই ঘটনা মহারাষ্ট্রের অন্যতম জনপ্রিয় কাহিনি হিসেবে প্রচলিত।

মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে শিবাজী শুধুমাত্র দক্ষ যোদ্ধাই ছিলেন না, সামরিক সংগঠনের চিন্তাভাবনার দিক থেকে তিনি মুঘলদের থেকে অন্তত একটি দিকে অগ্রবর্তী ছিলেন। কারণ শিবাজী নৌবাহিনীর গুরুত্ব সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। আফজল খাঁকে হত্যার পর তিনি কোঙ্কন অঞ্চলে কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। এইজন্য তিনি ছোটো দ্রুতগতিসম্পন্ন নৌবাহিনী গঠন করেছিলেন। যদিও এই নৌবহর ইউরোপের বৃহদাকার নৌশক্তির মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল না, তবে বাণিজ্যতরী আটক করতে সক্ষম ছিল। শিবাজীর এই নৌবহর গঠনের উদ্দেশ্য ছিল অনেকগুলি সমুদ্র দুর্গ গঠন যাতে জঞ্জিরার সিদ্দিদের মোকাবিলা ও প্রতিহত করা যায়। বস্তুত ক্ষুদ্র হলেও শিবাজীর নৌশক্তির প্রতি গুরুত্ব আরোপ প্রশংসনীয়।

ঔরঙ্গজেব মুঘল সম্রাট হয়ে তার মামা শায়েস্তা খাঁকে দাক্ষিণাত্যে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রেরণ করেন। ইতিমধ্যে শিবাজী দক্ষিণ কোঙ্কন আক্রমণ করলেও শায়েস্তা খাঁ উত্তর কোঙ্কন অভিযান করে কল্যাণ দুর্গ দখল করে নেয় ও পুনের সন্নিহিত অঞ্চল বিধ্বস্ত করে। ১৬৬৩-এর এপ্রিল পর্যন্ত এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বজায় থাকলেও শিবাজী এক রাত্রে (৫ এপ্রিল) অতর্কিতে শায়েস্তা খাঁর শিবির আক্রমণ করেন এবং শায়েস্তা খাঁর পুত্র ও তার কিছু অনুগামী নিহত হয় ও শায়েস্তা খাঁ নিজে আহত হয়। মুঘল শিবিরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে শিবাজীর এই আক্রমণ পুরোপুরি সফল ছিল। এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই ১৬৬৪ সালের জানুয়ারিতে শিবাজী মুঘলদের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সুরাট বিধ্বস্ত করেন। শিবাজীর আগমনের সংবাদে সুরাটের তৎকালীন গর্ভনর ইনায়েত খ পালিয়ে যায়। শিবাজী কয়েকদিনে অভিযান করে ব্যাপক ধনসম্পদ হস্তগত করেন। বস্তুত সুরাটে উপস্থিত হয়ে শিবাজী ঘোষণা করেন যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনও ইংরেজ বা অন্য কোনও ব্যবসায়ীর ক্ষতি করতে আসেননি, তিনি এসেছিলেন মুঘল প্রতিনিধি শায়েস্তা খা কর্তৃক পুনার। সন্নিহিত অঞ্চল লুঠ ও এর ফলে তার আত্মীয়স্বজনের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে। ১৬৬৪-এর ৬ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সুরাটে অভিযান চালানোর পর ১০ জানুয়ারি শিবাজী সুরাট ত্যাগ করেন। ১৭ জানুয়ারি যখন মুঘল বাহিনীর সঙ্গে সুরাটের গর্ভনর ইনায়েত খাঁ সুরাটে প্রবেশ করে তখন ক্ষুব্ধ জনতা তাদের ধিক্কার জানায় ও তাদের উপর ময়লা নিক্ষেপ করে। এতে ইনায়েত খাঁর পুত্র ক্ষুব্ধ হয়ে এক নিরীহ দরিদ্র হিন্দু ব্যবসায়ীকে হত্যা করে। শায়েস্তা খাঁর ওপর আক্রমণ ও সুরাট বন্দর অভিযান মুঘল সাম্রাজ্যের মর্যাদায় আঘাত হেনেছিল, বিশেষত সুরাট বন্দর শিবাজীর হাতে বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে ঔরঙ্গজেব শিবাজীকে প্রতিরোধ করতে অন্যতম প্রবীণ সেনাধ্যক্ষ জয় সিংহকে প্রেরণ করেন।

জয় সিংহ ১৬৬৫ সাল ধরে পুনের চারপাশে শিবাজীর জায়গির বিধ্বস্ত করেন এবং একে একে বৃহৎ পুরন্দর-সহ শিবাজীর অনেকগুলি দুর্গ দখল করে নেন। শিবাজী যখন পুরন্দর দুর্গের নীচে জয় সিংহের শিবিরে প্রবেশ করেন তখন জয় সিংহের নির্দেশে শিবিরের বাইরে মুঘল বাহিনী নির্বিচারে শিবাজীর অনুগামীদের হত্যা করে। হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে শিবাজী জয় সিংহের প্রদত্ত সকল শর্ত মেনে নেন। মুঘলরা শিবাজীর ২৩টি গুরত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করে শিবাজীকে কেবলমাত্র রাজধানী রায়গড়-সহ ১২টি দুর্গের অধিকার প্রদান করে। শিবাজীর অধীনে থাকা সব অঞ্চল মুঘলদের আনুগত্যাধীন করা হয় এবং শিবাজীর পুত্র শম্ভুজীকে ৫০০০ মনসব প্রদান করা হয়। ঐতিহাসিক স্টুয়ার্ট গর্ডনের মতে, পুরন্দরের উক্ত সন্ধি মুঘলদের কাছে। শিবাজীর বশ্যতা স্বীকার ছিল না, বরং তা ছিল সম্প্রসারিত সমঝোতার ফল যা মহারাষ্ট্রকে ক্ষমতার বাস্তবতা এবং জয় সিংহের বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা দখলের সামগ্রিক পরিকল্পনাকে প্রতিফলিত করে। পুরন্দরের সন্ধি অনুযায়ী শিবাজী কিছুকাল মুঘলদের অধীনে সেনাধ্যক্ষ হিসেবে চমকপ্রদ দক্ষতা দেখালেও জয় সিংহ মুঘলদের প্রতি শিবাজীর আনুগত্য সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। বিশেষত ১৬৬৪-এর শেষ দিকে শিবাজীর এক প্রধান সেনাধ্যক্ষ বিজাপুরে যোগদান করলে জয় সিংহ মুঘলদের প্রতি শিবাজীর আনুগত্য অটুট রাখতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেন। এমতাবস্থায় জয় সিংহ ঔরঙ্গজেবকে শিবাজীর সঙ্গে মুঘল রাজধানী আগ্রায় সাক্ষাতের পরামর্শ দেন।

জয় সিংহের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও নিরাপত্তা জনিত চরম আশ্বাস লাভের পর শিবাজী ১৬৬৬-এর মে’র প্রথম দিকে ২৫০ জনের একটি ক্ষুদ্র সেনাদল নিয়ে আগ্রার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু আগ্রার রাজদরবারে প্রথম থেকেই বিভিন্ন ঘটনায় শিবাজী ক্ষুব্ধ হন। শিবাজী রাজদরবারে উপস্থিত হলেও ঔরঙ্গজেব তাঁর সঙ্গে কোনও কথা বলেননি ও শিবাজীর উপস্থিতি সম্পর্কে কোনও সম্ভাষণ প্রদান করেননি। নিম্ন-পদমর্যাদাভুক্ত অভিজাতদের ন্যায় শিবাজীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ক্রুদ্ধ শিবাজী প্রদত্ত সাম্মানিক উত্তরীয় প্রত্যাখান করেন এবং রাজদরবার থেকে বেরিয়ে যান। কারণ শিবাজী ছিলেন মারাঠা রাজা যেখানে ঔরঙ্গজেবকেবিজাপুরের নামমাত্র বিদ্রোহী জমিদার ছাড়া আর কিছুই মনে করতেন না। এদিকেমুঘল রাজদরবারে অভিজাতদের নিজ পক্ষে টানার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন ছিল তা শিবাজীর কাছে প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। ঔরঙ্গজেব তাকে কাবুলে নিয়োগের নির্দেশ দেন। কাবুলে গমনকালে শিবাজীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। শিবাজী কাবুলে যেতে অস্বীকার করলে সেই নির্দেশ বাতিল হয়ে যায়। এর পর দীর্ঘ টানাপোড়েন ও শর্ত-প্রতিশর্তের পর জুলাইয়ের প্রথমদিকে পারিপার্শ্বিক অবস্থা তাকে দাক্ষিণাত্যে পলায়নের সুযোগ করে দেয়। শিবাজী অসুস্থতার ভান করে স্থানীয় ব্রাহ্মণদের মিষ্টি বিতরণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিতরণযোগ্য সেই সব বিশাল মিষ্টির ঝুড়ির একটিতে আত্মগোপন করে ত্রিস্তরীয় নজরদারি এড়িয়ে পলায়ন করতে সক্ষম হন। এই পলায়ন এতটাই নিখুঁত ছিল যে পরবর্তীকালে ঔরঙ্গজেব বার বার অনুসন্ধান করেও এই পলায়নের কৌশল খুঁজে বের করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত এই পলায়ন ঔরঙ্গজেবের জীবনভর অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা ঔরঙ্গজেব নিজের শেষ দলিলে লিপিবদ্ধ করেন।

আগ্রা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর শিবাজী তিন বছর মুঘলদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করলেও ১৬৬৯-এমুঘলরা শিবাজীর আগ্রায়। গমনের ব্যয় দাবি করলে সেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ভঙ্গ হয়। শিবাজী সেই সুযোগে মুঘলদের থেকে সিংহগড়, পুরন্দর, রোহিগ, লোহগড় ও মান্থলি দুর্গ জয় করে নেন। ১৬৭০-এর অক্টোবরে শিবাজী পুনরায় সুরাট। অভিযান করে বিধ্বস্ত করেন ও ১৬৭১-এর পশ্চিম খান্দেশের মুলহের ও সলহের দুর্গ মুঘলদের থেকে জয় করেন। এই দুই দুর্গ লাভ। করায় শিবাজী সুরাট বন্দরের বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। একই সময়ে তিনি নাসিক ও পুনের সন্নিহিত অঞ্চল থেকে মুঘলদের বিতাড়িত করে নিজের হৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেন। ১৬৭২-১৬৭৩ সালে বিজাপুরের সুলতানের মৃত্যুর সুযোগে হুবলি লুঠ করেন ও পানহালা দুর্গ দখল করেন। এই ভাবে রাজ্যাভিষেকের আগে শিবাজী তার রাজ্যকে আয়তনে বৃদ্ধি করেন।

মুঘল ও বিজাপুরের থেকে নিজ সামরিক দক্ষতায় বহু অঞ্চল ও দুর্গ জয় করে শিবাজী নিজ রাজ্য গঠন করলেও শিবাজী ও তার মন্ত্রী-পরিষদের কাছে শিবাজীর আনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেক না হওয়ার অসুবিধা অনুভূত হতে থাকে। কারণ তত্ত্বগতভাবে রাজপদে অধিষ্ঠিত না হওয়ায় একদিকে বিজাপুর ও মুঘলদের কাছে নামমাত্র বিদ্রোহী জমিদার হিসেবে পরিগণিত হতে থাকেন তেমনি বিজিত সব অঞ্চল ও জনজীবনের উপর তার আইনি বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এছাড়া শিবাজীর নেতৃত্বে ভোঁসলে মারাঠা গোষ্ঠীর উত্থান অন্যান্য সম সামাজিক মর্যাদার মারাঠা গোষ্ঠীকে ঈর্ষান্বিত করে। তারা শিবাজীর অধীনে না থেকে মুঘল ও বিজাপুরের প্রতি আনুগত্য প্রদানে সচেষ্ট হয়েছিল শিবাজীকে একজন ভুইফোড় বিদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করে। সুতরাং এইসকল গোষ্ঠীর কাছে শিবাজীর মর্যাদা প্রদর্শনের প্রয়োজন ছিল।। সুতরাং একটি আনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেক তাকে সকলের কাছে রাজা হিসেবে প্রতিপন্ন করতে পারত এবং বিজাপুর ও গোলকোণ্ডার শাসকের ন্যায় সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারত। সর্বোপরি বৃহৎ মহারাষ্ট্রীয় মননে শিবাজীকে হিন্দুধর্মের রক্ষক হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছিল এবং স্বাধীন রাজা হিসেবে শিবাজীর পদমর্যাদার আনুষ্ঠানিক দাবির দ্বারা রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিতে হিন্দু জাতির সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ করতে আগ্রহী ছিল।

কাশীর বিখ্যাত পণ্ডিত গাগা ভট্ট হিন্দু শাস্ত্রমতে শিবাজীকে একজন ক্ষত্রিয় রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ১৬৭৪-এর ৬ জুন রায়গড় দুর্গে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর বহু জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিবাজীর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন করেন। অভিষেক কার্য সম্পূর্ণ হওয়ার পর শিবাজী ‘ছত্রপতি’ উপাধি ধারণ করেন। এই রাজ্যাভিষেকের মাধ্যমে শিবাজী শুধুমাত্র একজন সমকালীন অন্যান্য বৃহৎ রাজ্যের সমমর্যাদার রাজা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হলেন না, তার সঙ্গে মহারাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে মধ্যযুগে এক হিন্দু রাজ্যের উত্থান হয়েছিল। আর এই উত্থান সম্ভব হয়েছিল সামরিক ও সাংগঠনিক দক্ষতার দ্বারা বিজাপুর ও মুঘলের মতো শক্তিকে বার বার পর্যদস্ত। করার মাধ্যমে । শুধু বিজেতা নন, প্রশাসক হিসেবে তিনি যে দক্ষতার পরিচয় দেন তা পরবর্তী এক শতাধিককালের বেশি সময় মারাঠা রাজ্যকে সর্বোভৌমত্ব ধরে রাখতে সহায়তা করেছিল। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন, “ শিবাজীর চরিত-কথা আলোচনা করিয়া আমরা এই শিক্ষা পাই যে, প্রয়াগের অক্ষয় বটের মতো হিন্দুজাতির প্রাণ মৃত্যুহীন; কত শত বৎসরের বাধা-বিপত্তির ভার ঠেলিয়া আবারমাথা তুলিবার, আবারনূতন শাখাপল্লব বিস্তার করিবার শক্তি তাহাদের মধ্যে নিহিত আছে। ধর্মরাজ্য স্থাপন করিলে, চরিত্রবলে বলীয়ান হইলে, নীতি ও নিয়মানুবর্তিতাকে অন্তরের সহিত মানিয়া লইলে, স্বার্থ অপেক্ষা জন্মভূমিকে বড়ো ভাবিলে, বাগাড়ম্বর অপেক্ষা নীরব কার্যকে সাধনার লক্ষ্য করিলে জাতি অমর অজেয় হয়।”

শুভজিৎ আওন

(হিন্দু সাম্রাজ্যদিনোৎসব উপলক্ষ্যে প্রকাশিত)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.