শ্রীক্ষেত্রে শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প

“বেরোবে তো? উঠে তৈরি হও না। এখন আবার সিগারেট ধরালে কেন?” ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়তে আঁচড়াতে বলল সুমনা। উঠে আসা চুল পুঁটলি পাকিয়ে ওয়েস্টবিনে ফেলতে গিয়েও রেখে দিল ড্রয়ারে।“পাগোল, এই ভিড়ের মধ্যে কেউ হুজুক করে?”“অনেক লোক হুজুক করে বলেই তো ভিড় হয়? আর হুজুক বলছ কেন? ভক্তি। নাও রেডি হয়ে নাও। ওদের দুজনের স্নান হয়ে গেছে আগেই। আমিও তৈরি হচ্ছি। বেড়াতে এসে তাও আবার তীর্থস্থানে এসে কেউ এমন গড়িমসি করে?”“সারা বছর দৌড়োচ্ছি। বেড়াতে আসাই তো খেয়ালখুশি গড়িমসি করার জন্য। ইচ্ছা হল শুয়ে রইলাম, খেয়াল হল সাঁতার কাটলাম।” সিগারেটটা অ্যাশট্রে তে গুঁজে উঠে বসে আড়িমোড়া ভাঙল ভাস্কর।  “সে আবার কী? পুরীতে এসে জগন্নাথ মন্দির দর্শন করব না? পুজো দেব না?”“তোমাকে কে মানা করেছে? তুমি যাও না। লাঞ্চের মধ্যে ফিরবে তো? রথের জন্য যা ভিড়, তাতে তো মনে হয় না বিকেল চারটের আগে ফিরতে পারবে।”“অসীমাদি পাণ্ডার নম্বর দিয়েছে। আমি যোগাযোগ করেছি। বলেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করিয়ে দেবে।”“ওফ্‌! ঐ এক হয়েছে পাণ্ডার দল। ভগবানকেই বিশ্বাস করো যদি, তার কাছে পৌঁছোনোর জন্য মিডল্‌ময়ান কেন? তিনি যখন সর্বত্র বিরাজমান, তাহলে মন্দিরেই বা যেতে হবে কেন?”“বা রে, স্থান মাহাত্ম্য নেই? তাহলে মন্দির কেন, চতুর্দিকে এত শত মসজিদ চার্চ দেখছ, একই প্রশ্ন করা যায়। আমাদের মন্দিরে তো বিগ্রহ থাকে। বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে পুজো হয়। যারা বলে ঈশ্বর সম্পূর্ণ নিরাকার, তার মূর্তি বা ছবি আঁকাও চলে না, তারা কী দেখতে কেন নিজেদের উপাসনার জায়গা বানিয়েছে? পাঁচজনের সঙ্গে মেশাটাও সোশাল ডিউটি, বুঝলে?”“বুঝলাম। কিন্তু জানো তো আমার ভক্তি বিশ্বাস কিস্যু নেই। কেন শুধু শুধু নিজের সঙ্গে টানছ?”“মুনাই টুকাই তখন থেকে তৈরি হয়ে বসে আছে জগন্নাথ টেম্পল যাবে বলে। তুমি না গেলে আমি লাইনে দাঁড়িয়ে এই ভিড়ে ওদের সামলাতে পারব?”“প্লীজ় ডোন্ট্‌ রিক্স দেম। নিজে যাচ্ছ যাও, পাণ্ডাকে যত খুশি ঘুষ দাও। বাধা দিচ্ছি না। বাচ্চাদুটোকে নিয়ে টানাটানি করে কষ্ট দিও না। বাই এনি চান্স হারিয়ে গেলে? ওরা কোথায়?”“বাগানে খেলছে।” রাগত মুখে বলল সুমনা।“তাহলে আমি একটু পরে রেডি হয়ে ওদের সী-বীচে বিয়ে যাচ্ছি। অবশ্য সমুদ্রে নামলে আবার ফিরে এসে স্নান করতেই হবে। ওফ্‌, শালা ছুটিতে এসেও ছুটি নেই। তুমি কখন ফিরছ, একবার ফোন করে জানিও। বুঝতে পারব, ওয়েট করব নাকি ওদের দু’জনকে অ্যাট লিস্ট লাঞ্চ করিয়ে রাখব।”“বারোমাস তিরিশ দিন বলছি না, রথের সময় জগন্নাথ ধামে এসে জগন্নাথকেই না দেখে চলে যাবে; তাও আবার বছরকার দিনে এসে? রথের সময় তো ভিড়ে বিগ্রহ দেখার সুযোগই পাওয়া যাবে না। আচ্ছা নাস্তিকের পাল্লায় পড়েছি। নিজে পুজো না দাও, অ্যাট লিস্ট মন্দিরে তো সঙ্গে থাকতে পারতে। মন্দিরটাও তো দর্শনীয় অ্যাজ় অ্যান আর্কিওলজিকাল সাইট। ছেলেমেয়েদুটো দেখত।”“শোনো, মন্দিরের গায়ে যা ভাস্কর্য আছে, বাচ্চা ছেলেমেয়েদের না দেখাই মঙ্গল। তারা যদি খুঁটিয়ে দেখে তেমন কিছু প্রশ্ন করে, উত্তর দিতে পারবে?”“মোটেই না। আমি এর আগেও এসেছি। তেমন কিছু আদৌ চোখে পড়েনি। তাহলে তো আমাদের কোনারকটাই আগে ক্যান্সেল করতে হয়। আর লাইন দিয়ে পুজো দিতে গিয়ে কারও অত ভাস্কর্য দেখার সময় হয় না।”“দেখাই যখন হবে না, তখন গিয়ে লাভ কী? রোজ হাজার খানেক লোক ফুল বেলপাতা দিয়ে নোংরা করে পুরাতত্ত্বের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। আমি এসেছি এই উপলক্ষ্যে শনি-রবি সিএল মিলিয়ে পরপর টানা আট দিন ছুটি ম্যানেজ করা গেল বলে।” না যাওয়ার যতরকম অজুহাত খাড়া করা যায়। বরকে উত্তর দিতে গিয়েও দেওয়া হল না। সুমনার চলভাষ বেজে উঠল। পাণ্ডার ফোন। “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি বেরোচ্ছি। রেডি…”সুমনা বিকেল পাঁচটায় ফিরল বেশ ব্যাজার হয়ে। পাণ্ডা বড় বড় কথা বলেছিল। কিন্তু একেই রথের ঠিক আগের দিন বলে দেবতাকে তো দেখাই গেল না। ভূদেবী, শ্রীদেবী, সুদর্শন ও মাধব দেবতাও ভালো করে দর্শন করা যায়নি। রথেরই প্রস্তুতি চলছে। শুধু পুজোর ডালা ও দক্ষিণা দেওয়া ছাড়া পুজো দেওয়া বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই করা যায়নি। পাণ্ডা সুমনাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে অন্য যযমান ধরতে গিয়েছিল। গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসি নিয়ে ভাস্কর বলল, “তাহলে পুণ্যার্জন কতটা হল – হাফ না সিকি না সাড়ে বারো পার্সেন্ট না…”উত্তর না দিয়ে সুমনা স্নানঘরে ঢুকে দরজা দিল। পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে এসেই বলল, “আগামীকাল রথযাত্রা কিন্তু অত্যন্ত বর্ণাঢ্য স্পেক্টাকুলার ব্যাপার। তাতে বাধ সেধো না। দেশবিদেশ থেকে সাংবাদিক বা ভিভিআইপি-রাও এই রথযাত্রা দেখতে ও কভার করতে আসে। তোমার না হয় উৎসাহ নেই, মুনাই টুকাইকে তো দেখতে দেবে।”
সমুদ্রমুখী হোটেলের সামনে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে জগন্নাথ বলভদ্র ও সুভদ্রা মাসীর বাড়ি গুণ্ডিচার মন্দিরে যান না। সে পথ আলাদা। তাই ব্যালকনি বা হোটেলের গেট থেকে রথযাত্রার ঝলক দেখারও সুযোগ নেই। অতএব সুমনার তাড়নায় সবাইকে জগন্নাথ মন্দির থেকে গুণ্ডিচার পথে কোথাও সুবিধাজনক জায়গা নিয়ে দাঁড়াতে হবে। রথের সঙ্গে সঙ্গে গুণ্ডিচা মন্দির পর্যন্ত যাওয়া পোষাবে না, সম্ভবও হবে না। আগামীকাল ভোরেই চিল্কা যাবে। পরের দিন নন্দনকানন। একদিন বিরতি দিয়ে তার পরের দিন কোনারক। ফিরে এসে একটা প্রাইভেট সী বীচে কাটিয়ে আসবে। একদিন বিশ্রাম। তারপর উল্টো রথের দিন দুপুর দুটো পঞ্চান্নোর ট্রেন ফেরা। ঠাসা ভ্রমণসূচী।লোকে সকাল থেকে রাস্তার ধারে জায়গা দখল করে রেখেছে, বিকেলে সুবিধাজনক জায়গা থেকে রথ দেখবে বলে। দুপুরে হাঁকপাঁক করে ভাত খেয়েই পাণ্ডা নির্দেশিত গ্র্যান্ড রোডের ওপর যথাস্থানে এসে দাঁড়াতে গিয়ে ওরা দেখে তিল ধারণের জায়গা নেই। একে একে বলভদ্র বা বলরামের চোদ্দ চাকাবিশিষ্ট রথ ‘তালধ্বজ’, সুভদ্রার বারো চাকার রথ ‘পদ্মধ্বজ’ ও শেষে জগন্নাথের ষোলো চাকাযুক্ত রথ ‘কপিধ্বজ’ বেরিয়ে এল। বাংলায় যেমন একটাই রথে তিন ভাইবোনকে বসিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়, পুরীতে তেমনটা হওয়ার জো নেই। প্রত্যেকের পৃথক গাড়ি। রথগুলো যথাক্রমে চুয়াল্লিশ, তেতাল্লিশ ও পঁয়তাল্লিশ ফুট করে উঁচু। মাথার ওপরটা সবকটারই লাল। উচ্চতায় দু-এক ফুটের তফাত দূর থেকে অতটা চোখে ধরা পড়ছিল না। সত্যিই অভিভূত করার মতো দৃশ্য যদি না পদপিষ্ট হতে হয়। আসানসোলে রথের দিন অবশ্যই রথের দড়িতে টান দেওয়ার চেষ্টা করে সুমনা, মুনাই ও টুকাই। সুমনা নিজের ও মুনাইয়ের সামান্য উঠে যাওয়া চুল সংগ্রহ করে রাখে রথের চাকার তলায় দেবে বলে – তাতে নাকি চুল ভালো হয়। কী হয় কে জানে? সুমনার তো ভুসভুসিয়ে চুল ওঠে। পুরীর এই জনসমুদ্রে ওসব করার সাহসই হল না। প্রকাণ্ড রথগুলোর চতুর্দিকে জনতাকে পোকামাকড়ের মতো তুচ্ছ মনে হচ্ছে। বিশেষ করে যদি ওপর থেকে দেখা যায়। সুমনা তো বটেই, ভাস্করের মুখও হাঁ হয়ে গিয়েছে এই দৃশ্য দেখে। হঠাৎ মুনাই সুমনার হাত ধরে টেনে বলল, “মা ভাই কোথায়?”“ভাই? এই তো ছিল। হ্যাঁগো, টুকাই তোমার হাত ধরে ছিল না?” সুমনা পেছন ফিরে ভাস্করকে প্রশ্ন করতে গিয়ে দেখে জনতার ভিড়ে ভাস্কর অনেকটা দূরে চলে গেছে, অনেকটা সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে যাওয়ার মতো। স্রোতের বিপরীতে মুনাইয়ের হাত ধরে ঠেলেঠুলে ভাস্করের কাছে পৌঁছোতেই ভাস্কর প্রশ্ন করল, “টুকাই কোথায়?”“তোমার সঙ্গে ছিল তো!”“ও তো ভালো করে দেখবে বলে তোমার কাছে গেল…”
হোটেলে ফিরে ম্যানেজারের কাছে ঠিকানা জেনে তিনজনেই সোজা একটা অটো ভাড়া নিয়ে পুরী পুলিস স্টেশন। সুমনার চোখদুটো কেঁদে লাল। কাঁদছে মুনাইও। ভাস্কর সেভাবে কাঁদতে না পারলেও রগদুটো দপদপ করছে। দুই বিবাহিত স্ত্রী পুরুষ পরস্পরকে দোষারোপ করে চলেছে – “যেমন হুজুক জেগেছিল, এই বয়সে খুকীর মতো রথ দেখব, রথ দেখব, দর্শন করব, বগল বাজিয়ে নাচব, পুণ্য করব! হল তো পুণ্য করা? ওনলি ফর ইউ ফুলিশ ওম্যান, ওনলি ফর ইউ। ছেলেটা এই জনসমুদ্রে কোথায় ভেসে গেল, কার হাতে পড়ল, স্ট্যাম্পিড হল কিনা…”“একদম অলুক্ষুণে কথা বলবে না তো। তোমার মতো নাস্তিকের জন্যই এমনটা হল। জগন্নাথ ধামে এসে বলে জগন্নাথ দর্শন করব না। সবই নাকি হুজুকে নাচা, ভক্তি বলে কিছু হয় না। ছেলেটা তো তোমার কাছে ছিল, হাত ছাড়লে কোন আক্কেলে ঐ ভিড়ের মধ্যে ঐটুকু বাচ্চার? এখন বলছ ওনলি ফর ইউ!”পুলিস অফিসার শুনে বললেন, “দিস ইজ় ভেরি ব্যাড। আপনারা বাঙালীরাই বেশি বেশি নাস্তিক হন দেখেছি। তীর্থস্থানে এসে বলছেন দেবতা দর্শন করবেন না, রথযাত্রাকে গালি দিচ্ছেন। প্রে টু জগন্নাথ সো দ্যাট ইউ গেট ব্যাক ইওর সান সুন।”“স্যর আপনারাও হাত তুলে দিচ্ছেন ভগবানের ভরসায়? কীপিং অল মাই রেসপেক্ট টু লর্ড জগন্নাথ, কাজটা তো স্যর আপনাদেরই করতে হবে, দেবতার ভরসায় ফেলে রাখলে তো চলবে না। স্যর দেখুন স্যর প্লীজ়!…”নিজের বসদের ক্ষেত্রেও আগে পিছে এভাবে ‘স্যর স্যর’ করে না ভাস্কর, যতটা ছেলেকে ফিরে পেতে পুলিস অফিসারদের করছে। “উই উইল ট্রাই আওয়ার বেস্ট। বাট ইউ শুড নট লুজ় ফেইথ ইন গড। এখন হোটেলে যান। রাত হয়েছে।”চিল্কা, ননন্দকানন, কোনারক, জলকেলি, কেনাকাটা – বলাবাহুল্য সব লাটে উঠল। ছয় দিন ধরে শুধু পারস্পরিক ঝগড়া, দোষারোপ। ছোট্ট আট বছরের মেয়েও সাইট সিইং দেখার আনন্দ জলাঞ্জলি দিয়ে কখনও ভাইয়ের দুঃখে কাঁদে, তো কখনও মা-বাবার ঝগড়া দেখে। আবার পরস্পরকে ভোলাতে গিয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই ফেলছে বাপ-মা-কন্যা সবাই। ভালোমন্দ খাওয়ার রুচি নেই। পেট যাহোক করে ভরলেই হল। বিকেলের চা স্ন্যাকস্‌ ঠিক মতো নেয় না। মুনাই বেচারার ভ্রাতৃ শোকের মধ্যেও খিদে পেয়ে যাচ্ছে। তবে বায়না করছে না খাবার নিয়ে। পটেটো চিপস্‌ খেতে খুব ইচ্ছা করলেও ভয়ে ভয়ে বলতে পারছে বা যদি না সুমনা নিজেই এক প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দেয়। সুমনার চোখ তো দুটি তো কেঁদে কেঁদে পান্তুয়া হয়ে গেছে। এক মনে মাকালী লোকনাথবাবা থেকে জগন্নাথ দেব সবাইকে মানত করে বসে আছে। ভাস্কর মুখে সুমনার ওপর হম্বিতম্বি করলেও পরক্ষণে কপালে হাত দিয়ে বলছে, “ছেলেটাকে পাইয়ে দাও ঠাকুর। আমি বিশ্বাস না করলেও কথা দিলাম, সামনের বার এসে আবার নিজের হাতে পুজো দেব। এ বারেই পাঁচ হাজার টাকা জগন্নাথ মন্দিরে দিয়ে তারপর যাব। শুধু ছেলেটাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দাও।” দু’দিন দেখে ভাস্করের সঙ্গে পরামর্শ করে ফেরার টিকিট ক্যানসেল করে দিল সুমনা। হোটেল ও ট্রেইন বুকিং সেই করেছিল। কোনও খোঁজ খবর নেই। ষষ্ঠ দিন একটা লাশ সনাক্ত করার জন্য থানা থেকে ফোন এল। সুমনা শুনেই ডুকরে উঠল। মেয়েরা কান্নাকটি করলে এইরকম সময় কাজের কাজটা গৃহকর্তাকেই সচরাচর করতে হয়। বলল, “এই অশান্তি ভোগ করার চেয়ে গিয়ে দেখে আসা যাক, বডিটা ওর নাকি ওর নয়। কিন্তু বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে মর্গে যাওয়া কি ঠিক? আবার মুনাইকে একাও ছাড়া উচিত নয়। ছাড়লে – একটা গেছে, অন্যটাও যদি…।ছিছি এসব ভাবতে এই। যাইহোক, মেয়েকে চোখে চোখে রাখবে বলে মনে ব্যাকুলতা নিয়েও সুমনা নিজেও থেকে গেল হোটেলে। গোছগাছও বাকি। একমনে ঠাকুরকে ডাকছে, কিন্তু আর মনে হচ্ছে আশা নেই। পরের দিন উল্টোরথ। সেইদিন ওদের আসানসোলে ফেরার কথা ছিল। আর ফেরা? অফিসে ফোন করে ভাস্কর জানিয়ে দিল যে ও যথাসময়ে জয়েন করতে পারবে না। ঘটনাটা বলায় খ্যাঁচা মিত্র সাহেব পর্যন্ত “ওকে ওকে টেক কেয়ার। কোনও সাহায্য লাগলে বলবেন। আর সুখবর থাকলেও জানাবেন।” আর সুমনা তো অফিস কাছারি সব ভুলে আছে। ওর অফিসে একটা ইমেইল নিজের মোবাইল থেকে কোনওক্রমে করেছে। ছেলে হারানোর ষষ্ঠ দিন ভোরে উঠতে না উঠতেই আবার চলভাষে ডাক। এই হয়েছে মুশকিল, খবর পেয়ে কেউ কুটো নেড়ে দুটো করতে পারছে না, কিন্তু ভদ্রতা দেখাতে ফোন করা চাই। বিরক্ত হয়ে অজানা নম্বর দেখেও ফোন ধরল। ফোনে একই কথা ভাঁটাতে, আর সবাইকে একই উত্তর দিতে আর ভালো লাগছে না। শাশুড়ী তো প্রতিবার সুমনাকেই অসাবধানতার জন্য দুষছেন। একমাত্র মা বাবা কিংবা বোন ফোন করলে সজল চোখে রুদ্ধ কণ্ঠে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে মনের ভার হাল্কা করা যাচ্ছে। “হ্যালো, মিসেস মুখার্জী বলছেন তো? আমনার মেয়ের নাম কি মুনাই?”বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। মুনাই এই তো ঘরে ছিল, এর মধ্যে সেও –- হা ঈশ্বর!!মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। ওপাশের এক নারী কণ্ঠ বলল, “একটি আড়াই-তিন বছরের ছেলেকে আমাদের অন্য এক থানায় কেউ এসে জমা করেছে। সেও রথে হারিয়ে গিয়েছিল। এখন ভীষণ কান্নাকাটি করছে। আপনাদের নাম করল। আপনাদের দুজনের নাম জানি, কিন্তু মেয়ের নাম জানি না। তাই প্রশ্ন করলাম। আপনাদের তো আজই ফেরার টিকিট ছিল।”“ক্যানসেল করে দিয়েছি। কোথায় যেতে হবে বলুন। কোন থানায়? আমরা এক্ষুণি যাচ্ছি।” ও্ফ্‌! ভাস্কর যে এই সময় কোন দিকে পালাল? এক্ষুণি বেরোতে হবে। নিজের তৈরি হওয়া বলতে নাইটি বদলে সালোয়ার কামিজ চড়িয়ে বেরিয়ে পড়া। আজকে মুনাইও সঙ্গে যাবে। কিন্তু ছেলের বাপ গেল কোথায়?ভাস্কর এল সুমনা তৈরি হতে হতে। কোথাও বেড়াতে গেলে সুমনা চোখে কাজল ছাড়া বেরোয় না। প্রসাধন করতে ভালোবাসে। কিন্তু সবকিছু এনেও সব তালগোল পাকিয়ে বাক্সে ভরা কিংবা এখনও হোটেলের ঘরটায় ছড়ানো ছেটানো। তিনজন উর্ব্বশ্বাসে ছুটল টাউন পুলিস স্টেশন। গিয়ে দেখে টুকাই নিজের মনে একটা খেলনা এরোপ্নেন নিয়ে খেলছে। আহ্! কী আরাম! পাসে বসা এক দম্পতি। ওঁরাই হারিয়ে যাওয়া ক্রন্দনরত বাচ্চাটিকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে যত্নআত্তি করে পুলিসকে জানিয়েছে। দেরির কারণ প্রথমত ভাষা, দ্বিতীয়ত থানার ফোন নম্বর না জানা। তার ওপর টাউন পুলিস চৌকি ডায়রি নিতে চায়নি। বলেছে, যেখান থেকে হারিয়েছে, সেই থানা নেবে। কিন্তু বৃদ্ধা অনেক অনুনয় করাতে হারানো প্রাপ্তি হিসাবে ছেলেটার জিম্মা নিয়েছে। ঐ দম্পতি টাউন পুলিস স্টেশনের কাছেই থাকেন। তাছাড়া টুকাই ওদের বাড়িতে গিয়ে একটু ‘মা মা, বাবা বাবা, মুনাই মুনাই’ করে প্রথমদিকে খানিক কেঁদেছে। দিদি মুনাই ছাড়া মা বাবার নাম রোজ তেমন শোনে না, উড়িয়া কথা বুঝতেও পারছিল না। তারপর আদর যত্ন আর খেলনা পেয়ে ভুলেও ছিল কিছুটা। বাড়ির সবার একটা মায়াও পড়ে যায়। শেষে মুনাই নামটিকে সম্বল করে থানায় নিয়ে এসেছে। ভাস্কর আর সুমনা কীভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাবে ভেবে পাচ্ছিল না। কিছু উপহার কিনে দেওয়ার জন্য পিড়াপিড়ি করল। বৃদ্ধ দম্পতি জোড় হাত করে মানা করে বললেন, “আমরা কর্তব্য করেছি, নিমিত্ত মাত্র। সবই প্রভুর ইচ্ছা।” ভাস্কর বলল, “আপনাদের কাছে চির-ঋণী রয়ে গেলাম। এই জগন্নাথের রথের চক্করে যা কাণ্ড হল, আমি তো আশাই করিনি ছেলেকে ফিরে পাব।”কপালে জোড় হাত লাগিয়ে সুমনা বলল, “ভগবানের অনেক কৃপা। স্বয়ং জগন্নাথ ওকে রক্ষা করেছেন।”

লেখিকা শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়সোদপুর, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.